ইরানের সর্বোচ্চ নেতা Ali Khamenei-কে হত্যার আগে তেহরানের ট্রাফিক ক্যামেরা, গাড়ি পার্কিং এলাকা, মোবাইল টাওয়ার এবং দেহরক্ষীদের চলাচলসহ পুরো নিরাপত্তা বলয়কে ঘিরে বছরের পর বছর ধরে নজরদারি চালিয়েছে ইসরায়েলি গোয়েন্দারা। ব্রিটিশ গণমাধ্যম Financial Times-এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, শনিবার তেহরানের পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় খামেনি নিহত হন। ওই এলাকা দীর্ঘদিন ধরে নজরদারির আওতায় ছিল। শীর্ষ ইরানি কর্মকর্তাদের দেহরক্ষী ও চালকদের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হতো। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুই ইসরায়েলি কর্মকর্তার বরাতে জানানো হয়, তেহরানের অধিকাংশ ট্রাফিক ক্যামেরা বহু বছর আগেই হ্যাক করা হয়েছিল এবং সেসব ভিডিও এনক্রিপ্ট করে ইসরায়েলের সার্ভারে পাঠানো হতো।
একটি নির্দিষ্ট ক্যামেরার মাধ্যমে শীর্ষ কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত গাড়ি কোথায় পার্ক করা হয় এবং নিরাপত্তা বলয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রম কেমন—এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। উন্নত অ্যালগরিদম ব্যবহার করে দেহরক্ষীদের ঠিকানা, দায়িত্ব পালনের সময়সূচি, যাতায়াতের রুট এবং তারা কাদের নিরাপত্তা দেন—এসব বিশ্লেষণ করে গোয়েন্দারা একটি পূর্ণাঙ্গ ‘প্যাটার্ন অব লাইফ’ বা জীবনযাত্রার মানচিত্র তৈরি করে। রিয়েল-টাইম নজরদারির তথ্যের ভিত্তিতেই হামলার পথ সুগম হয়।
পাস্তুর স্ট্রিট এলাকায় প্রায় এক ডজন মোবাইল ফোন টাওয়ারের নিয়ন্ত্রণও নেওয়া হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ফলে হামলার আগে নিরাপত্তা সদস্যরা কল করতে গেলে বারবার লাইন ব্যস্ত পাচ্ছিলেন এবং সতর্কবার্তা পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। এক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, তারা তেহরানকে নিজেদের শহরের মতো চিনতেন, তাই সামান্য অস্বাভাবিকতাও নজরে আসত। শুধু রিয়েল-টাইম তথ্য নয়, ইসরায়েল ও Central Intelligence Agency (সিআইএ) নির্দিষ্টভাবে জানত কখন ৮৬ বছর বয়সী খামেনি কার্যালয়ে থাকবেন এবং কারা বৈঠকে অংশ নেবেন।
এই গোয়েন্দা সক্ষমতার পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ। সিগন্যাল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট-৮২০০, Mossad-এর বিশেষ দল এবং সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত প্রচেষ্টায় প্রতিদিন তথ্য বিশ্লেষণ করা হতো। ‘সোশ্যাল নেটওয়ার্ক অ্যানালাইসিস’ নামে গাণিতিক পদ্ধতিতে বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। পুরো প্রক্রিয়াটি একটি লক্ষ্য নির্ধারণকারী কারখানার মতো কাজ করত। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইতাই শাপিরা বলেন, গোয়েন্দা কার্যক্রমে লক্ষ্য নির্ধারণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিষয়। নীতিনির্ধারকরা হত্যার সিদ্ধান্ত নিলে গোয়েন্দা সংস্থার দায়িত্ব হয় সুনির্দিষ্ট তথ্য সরবরাহ করা।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী শনিবার সকালে খামেনি কার্যালয়ে শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন—এ তথ্য নিশ্চিত হওয়ার পর হামলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যুদ্ধ শুরু হলে ইরানি নেতৃত্ব দ্রুত বাঙ্কারে আশ্রয় নিলে তাদের হত্যা করা কঠিন হয়ে যেত। সূত্র জানায়, ওই সময় খামেনি তার দুটি নিরাপদ বাঙ্কারের কোনো একটিতেও ছিলেন না। বাঙ্কারে থাকলে হামলা সফল করা কঠিন হতো।
এরপর মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র অনুমোদন দেন। চূড়ান্ত হামলার আগে সাইবার আক্রমণের মাধ্যমে ইরানের যোগাযোগ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া হয়, যাতে সহজে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘স্প্যারো’ নামের বিশেষ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা হয়, যা এক হাজার কিলোমিটার দূরের ক্ষুদ্র লক্ষ্যেও নির্ভুল আঘাত হানতে সক্ষম। খামেনির কমপ্লেক্সে প্রায় ৩০টি ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয় বলে দাবি করা হয়েছে।
সাবেক মোসাদ কর্মকর্তা সিমা শাইনের মতে, এই অভিযান দুই দশকের বেশি সময়ের প্রস্তুতির ফল। ২০০১ সালে তৎকালীন ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী Ariel Sharon ইরানকে প্রধান লক্ষ্য হিসেবে নির্ধারণের নির্দেশ দেন। এরপর থেকে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নস্যাৎ করা, বিজ্ঞানী হত্যা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের দুর্বল করার ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবে গোয়েন্দা সক্ষমতা জোরদার করা হয়। গত বছরের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধে একাধিক ইরানি পরমাণু বিজ্ঞানী ও ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তাকে হত্যা করাও সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছয়জনের বেশি বর্তমান ও সাবেক ইসরায়েলি গোয়েন্দা কর্মকর্তার সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়, খামেনিকে হত্যার বিষয়টি ছিল রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত; এটি কেবল প্রযুক্তিগত সাফল্য নয়। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মূল্যায়ন ছিল, পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হলে তাকে খুঁজে পাওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। কিংবা তিনি আত্মগোপনে না গিয়ে জনসমক্ষে শহীদ হওয়ার পথ বেছে নিতে পারেন। সিমা শাইন একটি হিব্রু প্রবাদ উল্লেখ করে বলেন, “খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষুধাও বাড়ে”—অর্থাৎ একের পর এক লক্ষ্য পূরণে ইসরায়েল আরও বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে।
Leave a Reply