বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) এবং সংগঠনটির কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাদিক কায়েম। সোমবার (১৩ জুলাই) তিনি নিজেই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
সাদিক কায়েম জানান, ছাত্রশিবিরে বছরে দুই দফায় সাংগঠনিক পুনর্গঠন বা ‘সেটআপ’ করা হয়। ২০২৬ সালের ষাণ্মাসিক সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসে তার দায়িত্বের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ছাত্রশিবিরের বছরে দুইবার সেটআপ হয়। ২০২৬ সালের ষাণ্মাসিক সেটআপে আমার বিদায় হয়েছে।”
এর আগে চলতি বছরের ১ মে রাজধানীর কাকরাইলের ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স বাংলাদেশ (আইডিইবি) কাউন্সিল হলে অনুষ্ঠিত জামায়াতে ইসলামীর থানা ও বিভাগীয় দায়িত্বশীল সম্মেলনে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্য দলটির মেয়রপ্রার্থী হিসেবে সাদিক কায়েমের নাম ঘোষণা করা হয়।
প্রার্থী ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, সংগঠনের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কোনো সদস্য রাজনৈতিক দলের মনোনয়ন নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে পারেন না। সেই অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতেই সাদিক কায়েমের ছাত্রশিবির থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা চলছে।
বর্তমানে সাদিক কায়েম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহ-সভাপতি (ভিপি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে মাঠপর্যায়ের সমন্বয়, কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সংগঠকদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার মাধ্যমে তিনি জাতীয় পর্যায়ে পরিচিতি লাভ করেন।
তার শিক্ষাজীবনের সূচনা হয় খাগড়াছড়ির বায়তুশ শরফ জব্বারিয়া আদর্শ মাদ্রাসায়। সেখান থেকে ২০১৪ সালে দাখিল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসা থেকে ২০১৬ সালে আলিম সম্পন্ন করেন। একই বছর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন এবং সেখান থেকেই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
জানা যায়, ২০১৩ সালেই সাদিক কায়েম বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। তবে দীর্ঘ সময় সংগঠনের পরিচয় প্রকাশ্যে না এলেও ২০২৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করেন। এর আগে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম কার্যত নিষিদ্ধ ছিল। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগেই চট্টগ্রামে অবস্থানকালে তিনি প্রকাশ্যে ছাত্রশিবিরের সরকারবিরোধী বিভিন্ন আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন।
সংগঠনের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তিনি ২০২৫-২০২৬ সেশনে প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাস থেকে কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং সর্বশেষ সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস পর্যন্ত ওই দায়িত্বে ছিলেন।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি ‘সালমান’ ছদ্মনামে পরিচিত ছিলেন। ওই সময় আন্দোলনের সামনের সারির সংগঠকদের নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা, বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নেতাকর্মীদের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা, প্রতিদিনের কর্মসূচি পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন, আন্দোলনের নয় দফাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বার্তা গণমাধ্যমে পৌঁছে দেওয়া এবং আন্দোলনের সাংগঠনিক যোগাযোগ বজায় রাখার কাজে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সামনের সারির যোদ্ধা ছিলেন তিনি। আন্দোলন চলাকালে ‘সালমান’ পরিচয়ে তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিলেন।
রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সাদিক কায়েম বিভিন্ন সামাজিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গেও সম্পৃক্ত ছিলেন। তিনি শিক্ষার্থীদের ওপর সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কাজ করা সংগঠন স্টুডেন্টস এগেইনস্ট ভায়োলেন্স এভরিহোয়্যার (সেইভ)-এর পরামর্শদাতা কর্মী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশ ইয়ুথ ইনিশিয়েটিভের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাত্র সংসদের সভাপতির দায়িত্বও পালন করেছেন তিনি। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন এবং সামাজিক উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তিনি ‘হিল সোসাইটি’ নামে একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ছাত্রশিবিরের সাংগঠনিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সাদিক কায়েম আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেবেন। এরপর দলটির মনোনীত প্রার্থী হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলে ব্যাপক আলোচনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে সাদিক কায়েম বা জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
Leave a Reply