সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশিত নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে। নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে সরকারের গঠিত পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটি ইতোমধ্যে মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে। আলোচনায় সর্বোচ্চ ক্ষেত্রে মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় এসেছে। তবে নতুন বেতন ও বিভিন্ন ভাতা একই সঙ্গে কার্যকর করা হবে, নাকি ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে—সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব মন্ত্রিসভার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, নবম জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনার কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে নতুন বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশের লক্ষ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো কাজ করছে। এ লক্ষ্যে বুধবার সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পে স্কেল পর্যালোচনা কমিটির ষষ্ঠ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় কমিশনের সুপারিশ, বিদ্যমান বেতনকাঠামোর সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তবায়নের আর্থিক ও প্রশাসনিক দিক নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়।
সভায় উপস্থিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এখনো আরও দুই থেকে তিনটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এসব বৈঠকে বিভিন্ন কারিগরি বিষয়, আর্থিক প্রভাব, গ্রেডভিত্তিক সুবিধা এবং বাস্তবায়নের কৌশল নিয়ে বিস্তারিত বিশ্লেষণ করা হবে। এরপর পর্যালোচনা কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভার কাছে পাঠানো হবে।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্যদের মধ্যে একটি বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে যে, সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বৃদ্ধি করা বাস্তবসম্মত হবে না। বরং নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তুলনামূলক বেশি সুবিধা দেওয়ার পক্ষে অধিকাংশ সদস্য মত দিয়েছেন। তাদের মতে, দীর্ঘ সময় ধরে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে নিচের গ্রেডের কর্মচারীরাই সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। ফলে নতুন বেতনকাঠামোতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে নিম্ন গ্রেডগুলোতে তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
শুধু মূল বেতন নয়, বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, যাতায়াত ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও নতুন করে পুনর্বিন্যাস করা হচ্ছে। মূল বেতনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এসব ভাতার পরিমাণ নির্ধারণের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর হলে ভাতার কাঠামোও যুগোপযোগী করা প্রয়োজন, যাতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বাস্তবিক অর্থে আর্থিক সুবিধা পান।
পর্যালোচনা কমিটির সদস্যরা নীতিগতভাবে একটি প্রস্তাবে একমত হয়েছেন। সেই প্রস্তাব অনুযায়ী, নতুন মূল বেতন ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর হতে পারে এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা ২০২৭ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে। তবে এটি এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়। কমিটি বিষয়টি মন্ত্রিসভার বিবেচনার জন্য রেখে দিয়েছে। ফলে বেতন ও ভাতা একই সঙ্গে কার্যকর হবে, নাকি পৃথক সময়ে বাস্তবায়ন করা হবে—সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।
একইভাবে নতুন পে স্কেল এক ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে নাকি দুই বা ততোধিক ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সেটিও এখনো নির্ধারিত হয়নি। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের ওপর সম্ভাব্য চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে মন্ত্রিসভাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ২৩ জুলাই অথবা ৩০ জুলাইয়ের নিয়মিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে বিষয়টি আলোচনায় আসতে পারে। প্রয়োজন হলে প্রধানমন্ত্রীর আহ্বানে নির্ধারিত সময়ের বাইরেও বিশেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সভা-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের নীতিগত অবস্থান প্রায় চূড়ান্ত। এখন সচিব পর্যায়ের কমিটি মূলত কারিগরি, আর্থিক এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন বিষয় বিশ্লেষণ করছে। এসব বিশ্লেষণ সম্পন্ন হলে চলতি জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা আগস্টের প্রথম সপ্তাহে সুপারিশ মন্ত্রিসভার বৈঠকে উপস্থাপন করা হতে পারে।
মন্ত্রিসভায় নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ধাপ, কার্যকরের সময়সূচি, বেতন-ভাতার কাঠামো এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদনের পর প্রস্তাবটি আইনি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ভেটিং সম্পন্ন হওয়ার পর সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললেই নতুন জাতীয় বেতনকাঠামোর গেজেট প্রকাশ করা হবে।
পর্যালোচনা কমিটির বৈঠকে অংশ নেওয়া একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রায় ১১ বছর ধরে নতুন বেতনকাঠামো দেওয়া হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। ফলে নতুন পে স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে এমন একটি কাঠামো তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে, যাতে কোনো গ্রেডের কর্মকর্তা বা কর্মচারী নিজেদের বঞ্চিত মনে না করেন।
তিনি আরও বলেন, বেতন কমিশনের সুপারিশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রতিটি গ্রেডের বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। এ কারণেই আরও দুই থেকে তিনটি বৈঠকের প্রয়োজন হতে পারে। প্রতিটি বৈঠকে খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, নতুন বেতন ও ভাতা বাস্তবায়নের সঙ্গে সরকারের বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের বিষয়টি জড়িত। ফলে সরকারের রাজস্ব আয়, বাজেটের সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই বাস্তবায়নের সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে। এ কারণে সচিব কমিটি বাস্তবায়নের ধাপসংক্রান্ত কোনো সুপারিশ দিচ্ছে না। বিষয়টি সম্পূর্ণভাবে মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে সম্প্রতি একটি সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীও নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। তিনি বলেন, নতুন জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত থেকে সরকার সরে আসেনি। বরং এটি বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার সম্পূর্ণভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ। তবে বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব পরিস্থিতি এবং সরকারি ব্যয়ের চাপ বিবেচনায় রেখে নতুন বেতনকাঠামো ধাপে ধাপে কার্যকর করা হবে।
অর্থমন্ত্রী আরও বলেন, পে স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। এখন সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিকল্পিতভাবে এটি কার্যকর করা, যাতে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নতুন বেতন সুবিধা পান এবং অন্যদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক ভারসাম্যও বজায় থাকে।
Leave a Reply