দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং সরকারের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন কিছু সময়ের জন্য স্থগিত রাখার পরামর্শ দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। তবে সংস্থাটির এই পর্যবেক্ষণ ও পরামর্শের পরও সরকার স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই। সরকারের মতে, বিষয়টি ইতোমধ্যে বাজেটে ঘোষণা করা হয়েছে এবং সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এ নিয়ে যথেষ্ট প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। ফলে এই পর্যায়ে বাস্তবায়ন স্থগিত করা সম্ভব নয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আইএমএফের বাংলাদেশ ও হংকংবিষয়ক মিশনপ্রধান ইভো ক্রজনারের নেতৃত্বে একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশন গত ১২ থেকে ১৬ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ সফর করে। পাঁচ দিনের এই সফরে প্রতিনিধি দলটি অর্থ বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি), বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব ব্যবস্থাপনা, ব্যয় কাঠামো এবং চলমান সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে আলোচনা করে।
এই বৈঠকগুলোর এক পর্যায়ে অর্থ বিভাগের সঙ্গে আলোচনায় নতুন জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও উঠে আসে। আইএমএফের প্রতিনিধি দল জানতে চায়, সরকার নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে কতদূর এগিয়েছে এবং এটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব কী হতে পারে।
জবাবে অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর হয়েছিল ২০১৫ সালে। অর্থাৎ প্রায় ১২ বছর ধরে নতুন কোনো পে-স্কেল বাস্তবায়ন হয়নি। এই দীর্ঘ সময়ের মধ্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা খরচ এবং জীবনযাত্রার সামগ্রিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে বর্তমান বাস্তবতায় সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন ও উন্নত বেতন কাঠামো চালুর বিকল্প নেই বলেই সরকার মনে করে।
আলোচনার সময় আইএমএফ জানতে চায়, নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে সরকারের কত অর্থের প্রয়োজন হবে। অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়, একবারে সম্পূর্ণ পে-স্কেল কার্যকর করতে আনুমানিক এক লাখ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হতে পারে। তবে সরকার পুরো ব্যয় একসঙ্গে বহন করবে না। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এটি দুই ধাপে বাস্তবায়নের চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। ফলে শুরুতেই পুরো অর্থের প্রয়োজন হবে না এবং ব্যয়ের চাপও তুলনামূলকভাবে নিয়ন্ত্রিত থাকবে।
এ সময় আইএমএফ প্রতিনিধি দল সরকারের আর্থিক সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। তারা উল্লেখ করে, বাংলাদেশ বর্তমানে আইএমএফের কাছ থেকে নতুন ঋণ ও আর্থিক সহায়তা চাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারের রাজস্ব ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। এতে সরকারের ঋণনির্ভরতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে। এই বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে আইএমএফ জানতে চায়, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন অন্তত কিছু সময়ের জন্য পিছিয়ে দেওয়া সম্ভব কি না।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরা হয়। অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা আইএমএফকে জানান, সরকার ইতোমধ্যে নীতিগতভাবে জুলাই মাস থেকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জাতীয় বাজেটেও এ বিষয়ে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে একটি স্বাভাবিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। এখন এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা বা বাস্তবায়ন স্থগিত করা হলে তা প্রশাসনিক ও সামাজিক—উভয় ক্ষেত্রেই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার কোনো পরিকল্পনা করছে না।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আইএমএফ সরাসরি “পে-স্কেল বাস্তবায়ন বন্ধ করুন”—এমন ভাষায় কোনো পরামর্শ দেয়নি। তবে আলোচনার পুরো প্রেক্ষাপট থেকে বোঝা গেছে যে সংস্থাটি বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে উদ্বিগ্ন। তারা বিশেষভাবে জানতে চেয়েছে, অতিরিক্ত ব্যয়ের অর্থ কোথা থেকে আসবে, এর অর্থায়নের পরিকল্পনা কী এবং এটি দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি আরও বলেন, আইএমএফের অন্যতম উদ্বেগ ছিল মূল্যস্ফীতি। বর্তমানে দেশে মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘদিন ধরেই ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। এই অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলে বাজারে অর্থের প্রবাহ বাড়বে, যা মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে তারা মনে করছে।
অর্থ বিভাগের পক্ষ থেকে অবশ্য এ বিষয়ে একটি বিশদ বিশ্লেষণ আইএমএফ মিশনের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে স্বল্পমেয়াদে মূল্যস্ফীতির ওপর কিছুটা চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অতীতেও একই ধরনের পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ২০১৫ সালে সর্বশেষ জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও মূল্যস্ফীতিতে সাময়িক প্রভাব পড়েছিল। তবে সে সময় মূল্যস্ফীতির হার তুলনামূলকভাবে কম থাকায় এর প্রভাব প্রায় তিন মাসের মধ্যে স্বাভাবিক হয়ে আসে।
অর্থ বিভাগের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বর্তমানে মূল্যস্ফীতির হার আগের তুলনায় অনেক বেশি হওয়ায় নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে এর প্রভাব কিছুটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। সরকারের ধারণা, মূল্যস্ফীতির ওপর সম্ভাব্য অতিরিক্ত চাপ ছয় থেকে সাত মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এরপর বাজার পরিস্থিতি, উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে বলে তারা আশা করছে।
সব মিলিয়ে, আইএমএফ বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নেওয়ার পরামর্শ দিলেও সরকার এখনো পূর্বঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী এটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অনড় রয়েছে। ফলে আগামী সময়ে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, রাজস্ব আহরণ, মূল্যস্ফীতির গতিপ্রকৃতি এবং পে-স্কেল বাস্তবায়নের ধাপভিত্তিক কৌশল—এসব বিষয়ই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে।
Leave a Reply