অর্থনৈতিক সংস্কারের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশ সরকারকে সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে বিভিন্ন পরামর্শ দিয়ে আসছে। বিশেষ করে সরকারি খাতের পরিচালন ব্যয় কমানো, রাজস্ব ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে অতিরিক্ত ব্যয় বা ভর্তুকি সীমিত রাখার বিষয়ে সংস্থাটি ধারাবাহিকভাবে গুরুত্ব আরোপ করেছে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সরকার সেই অবস্থান থেকে কিছুটা সরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। কারণ, দেশে দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়ে যাওয়ায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়ে সরকার নীতিগতভাবে দৃঢ় অবস্থানে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, কেবল আন্তর্জাতিক সংস্থার পরামর্শ অনুসরণ করে দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য দূর করা এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি হয়ে পড়েছে। সে কারণেই নবম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তুতি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা আইএমএফের অর্থনৈতিক সংস্কারসংক্রান্ত সুপারিশ ও পরামর্শকে যথাযথ গুরুত্ব দিই এবং সম্মান করি। তবে বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয়, শিক্ষা ব্যয়সহ প্রায় সব ধরনের জীবনযাত্রার খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই অবস্থায় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্তমান বেতন কাঠামো দিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই তাদের যৌক্তিক দাবি উপেক্ষা করা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। সরকার ইতোমধ্যেই ১ জুলাই থেকে নবম পে স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমরা আশা করছি, দেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আইএমএফও এ বিষয়ে কোনো আপত্তি করবে না।”
অর্থ বিভাগ ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে স্কেলের খসড়া প্রস্তাবে প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের মূল বেতন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করার সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যদিকে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য আরও বেশি সুবিধা রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এসব গ্রেডে মূল বেতন সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের যুক্তি হলো, নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীদের ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব তুলনামূলক বেশি পড়েছে। তাই তাদের জন্য তুলনামূলক বেশি হারে বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন।
সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার পর চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই সরকারি কোষাগার থেকে নতুন স্কেলের মূল বেতনের সম্পূর্ণ অর্থ পরিশোধ করা হবে। অর্থাৎ বেতন বৃদ্ধির মূল অংশ বাস্তবায়নে কোনো ধাপ রাখা হচ্ছে না। তবে বেতন-সংক্রান্ত বিভিন্ন ভাতা একসঙ্গে কার্যকর না করে সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় আগামী অর্থবছরে দুই ধাপে পরিশোধ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে একদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নতুন বেতন কাঠামোর সুবিধা পাবেন, অন্যদিকে সরকারের ওপর এককালীন অতিরিক্ত আর্থিক চাপও কিছুটা কমবে।
এদিকে বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন বিশেষ ভাতা নতুন পে স্কেল কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই বিশেষ ভাতা মূলত নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আগ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে চালু করা হয়েছিল। কিন্তু নতুন পে স্কেলে মূল বেতন এক লাফে দ্বিগুণ কিংবা কোনো কোনো ক্ষেত্রে তারও বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় এই বিশেষ ভাতা চালু রাখার আর কোনো যৌক্তিকতা থাকবে না। ফলে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হওয়ার দিন থেকেই এটি বন্ধ হয়ে যাবে।
এ বিষয়ে সাবেক অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, “সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন পে স্কেল দেওয়ার উদ্যোগ সময়োপযোগী এবং অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিতে নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মচারীদের জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে ১১তম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত কর্মচারীদের জন্য সর্বোচ্চ ১৪০ শতাংশ এবং প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত কর্মকর্তাদের জন্য ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির প্রস্তাবকে আমি যৌক্তিক মনে করি। এই পদক্ষেপ নেওয়া না হলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জীবনমান ধরে রাখা কঠিন হয়ে যেত। একই সঙ্গে প্রশাসনে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও সততা বজায় রাখাও বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াত।”
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে তিনি আরও বলেন, “অনেকেই মনে করেন সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়লে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অষ্টম জাতীয় পে স্কেল বাস্তবায়নের সময়ও এমন আশঙ্কা করা হয়েছিল, কিন্তু পরে দেখা গেছে মূল্যস্ফীতির ওপর এর উল্লেখযোগ্য কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়েনি। তাই নতুন পে স্কেল বাস্তবায়ন নিয়েও অতিরিক্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার কারণ নেই।”
সাবেক এই অর্থসচিব আরও জানান, সরকার নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের আগে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা, বাজেটের সক্ষমতা, রাজস্ব আয় এবং ভবিষ্যৎ আর্থিক দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছে। সেই বিবেচনা থেকেই চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই নতুন মূল বেতনের সম্পূর্ণ অংশ পরিশোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সরকারের ওপর একসঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক চাপ এড়াতে বিভিন্ন ভাতা আগামী অর্থবছরে দুই ধাপে বাস্তবায়নের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে একদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দ্রুত নতুন বেতন কাঠামোর সুফল পাবেন, অন্যদিকে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনাও ভারসাম্যপূর্ণ থাকবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
Leave a Reply