দীর্ঘ প্রায় ১১ বছর পর সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী জুলাই মাস থেকেই ধাপে ধাপে নতুন বেতনকাঠামো কার্যকর করা হতে পারে। তবে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের এই উদ্যোগের মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছে দেশের কয়েক কোটি বেসরকারি চাকরিজীবীর ভবিষ্যৎ, বেতন-ভাতা এবং সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলেও শুরু থেকেই সব ধরনের আর্থিক সুবিধা একযোগে কার্যকর করা হবে না। বর্তমানে আলোচনায় থাকা প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে সংশোধিত মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট অংশ কার্যকর করা হতে পারে। পরবর্তী সময়ে ধাপে ধাপে বাকি অংশের বেতন বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন ধরনের ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা সমন্বয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। ফলে আগামী জুলাই মাস থেকে পে-স্কেলের কার্যক্রম শুরু হলেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত বেতনের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক সুবিধা পেতে কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে নতুন পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত বহাল রেখেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে একাধিক বৈঠকে এর বাস্তবায়ন পরিকল্পনা, সম্ভাব্য আর্থিক প্রভাব, প্রশাসনিক সংস্কার এবং বাস্তবায়নসংক্রান্ত বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। একই সঙ্গে জনপ্রশাসনে কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি, জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক সেবার মান উন্নয়নের বিষয়গুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়েছে।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী বেতন-ভাতা গ্রহণ করছেন। এই পে-স্কেল অনুযায়ী মূল বেতনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের নিয়মিত ও বিশেষ ভাতা প্রদান করা হয়। এর মধ্যে অঞ্চলভেদে মূল বেতনের ৪৫ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা রয়েছে। এছাড়া সব গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য বর্তমানে মাসিক এক হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা প্রদান করা হয়। নির্দিষ্ট কিছু গ্রেডের কর্মচারীরা যাতায়াত ভাতা পান। অন্যদিকে প্রাধিকারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের জন্য সরকারি গাড়ি রক্ষণাবেক্ষণ এবং জ্বালানি সুবিধাও বিদ্যমান রয়েছে। এছাড়া দুই সন্তানের জন্য শিক্ষা সহায়ক ভাতা, বছরে দুটি উৎসব ভাতা এবং মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাংলা নববর্ষ ভাতাও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেয়ে থাকেন।
এদিকে নতুন পে-স্কেলকে ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের পাশাপাশি অবসরোত্তর ছুটিতে (এলপিআর) থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী, পেনশনভোগী এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যেও নতুন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে স্বায়ত্তশাসিত এবং আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখনও সরকারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন। কারণ এসব প্রতিষ্ঠানের একটি বড় অংশ নিজস্ব সার্ভিস রুলস কিংবা পৃথক প্রশাসনিক কাঠামোর আওতায় পরিচালিত হওয়ায় তাদের ক্ষেত্রে নতুন পে-স্কেলের সুবিধা কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে এখনও আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।
এদিকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো নিয়ে আলোচনা যত এগোচ্ছে, ততই সামনে আসছে দেশের বিশাল বেসরকারি কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতনির্ভর। শিল্প, সেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগ, গণমাধ্যমসহ দেশের অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ খাতেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।
কিন্তু এত বড় একটি কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর জন্য এখনও সমন্বিত চাকরি-নীতিমালা, চাকরির নিরাপত্তা, ন্যায্য ও মানসম্মত বেতন কাঠামো কিংবা কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ রয়েছে। কয়েক বছর আগে বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একটি সমন্বিত সার্ভিস রুলস প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেই উদ্যোগ এখনও বাস্তবায়নের মুখ দেখেনি। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগের মধ্যেই বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পৃথক নীতিমালা প্রণয়নের দাবিও নতুন করে জোরালো হয়ে উঠেছে।
সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপিত হওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মহলে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বেসরকারি চাকরিজীবীদের একটি বড় অংশের দাবি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বেতন বৃদ্ধি বাস্তবায়নের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম কর্মসংস্থানের মানদণ্ড নির্ধারণ, চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পেনশন সুবিধা চালু করা এবং শ্রমবান্ধব নীতিমালা প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, জনপ্রশাসনের অর্থাৎ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নবম পে-স্কেলের বিষয়টি মোটামুটি চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। তবে বেতন কত শতাংশ বৃদ্ধি পাবে কিংবা কত ধাপে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে এখনও কমিটির সদস্যরাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন। এছাড়া নতুন পে-স্কেলের আওতায় কোন শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী কী ধরনের সুবিধা পাবেন, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি।
Leave a Reply