বেসরকারি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষকদের বহুল প্রতীক্ষিত বদলি নীতিমালা প্রকাশের প্রায় দুই মাস অতিবাহিত হলেও এখনো শুরু হয়নি মাদ্রাসা এডুকেশন ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (মেমিস) সফটওয়্যার তৈরির কাজ। যদিও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মেমিস প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং সরকারের পক্ষ থেকে চলতি বছরের নভেম্বরের মধ্যে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) ও শিক্ষক বদলি কার্যক্রম চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তবুও বাস্তব অগ্রগতি এখনো প্রাথমিক ধাপেই সীমাবদ্ধ।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সফটওয়্যার উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় ট্রামস অব রেফারেন্স (টর) চূড়ান্তকরণ, টেন্ডার আহ্বান, কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠান নির্বাচন, দর-কষাকষি এবং চুক্তি সম্পাদনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলো এখনো সম্পন্ন হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সফটওয়্যার তৈরি শেষ করে ইএফটি ও শিক্ষক বদলি কার্যক্রম চালু করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যেই অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ। চলতি বছরে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে একের পর এক মহাপরিচালক (ডিজি) পরিবর্তন, অনেক শিক্ষকের এমপিও সংক্রান্ত জটিলতা, জাল সনদের অভিযোগ এবং দীর্ঘদিন ধরে মেমিস সফটওয়্যার উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির থাকার বিষয়গুলো প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে নতুন বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ২ জুন এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসা শিক্ষকদের জন্য বহুল আলোচিত বদলি নীতিমালা প্রকাশ করা হয়। এর দুই সপ্তাহ পর, ১৬ জুন অনুষ্ঠিত একনেক সভায় মেমিস প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়।
এই প্রকল্পের মেয়াদ নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। প্রকল্পের আওতায় শুধু শিক্ষক বদলির সফটওয়্যার নয়, বরং মাদ্রাসা ব্যবস্থাপনার জন্য সমন্বিত একটি আধুনিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হবে।
মোট ১৮টি মডিউল নিয়ে গড়ে তোলা হবে এই মেমিস সিস্টেম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
বর্তমানে প্রকল্পের ট্রামস অব রেফারেন্স (টর) প্রস্তুতের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, টর চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে দুটি সভা এবং একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে।
টরের সব শর্ত ও কারিগরি বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর সেটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। এরপর শুরু হবে টেন্ডার কার্যক্রম।
অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি জুলাই মাসের শেষ দিকে অথবা আগামী আগস্টের প্রথম সপ্তাহে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরিকল্পনা রয়েছে।
এরপর ধারাবাহিকভাবে—
সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগস্টের শেষ দিকে অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে সফটওয়্যার উন্নয়নের মূল কাজ শুরু হতে পারে।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন শাখা) মো. আবুল কালাম তালুকদার জানিয়েছেন, কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে ইএফটি ও শিক্ষক বদলির মডিউল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, টর চূড়ান্তকরণ, টেন্ডার, মূল্যায়ন, কনসালটেন্সি ফার্ম নির্বাচন এবং চুক্তির কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগস্টের শেষ কিংবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সফটওয়্যার তৈরির কাজ শুরু হবে এবং নভেম্বর মাসের মধ্যে ইএফটি ও বদলি কার্যক্রম চালুর চেষ্টা করা হবে।
প্রকল্পের পরিকল্পনা অনুযায়ী, কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের তিন মাসের মধ্যে চালু করা হবে—
অন্যদিকে, চুক্তির ছয় মাসের মধ্যে ১৮টি মডিউলই পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ২০২৭ সালের ডিসেম্বর থেকে মেমিসের সব কার্যক্রম মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের নিজস্ব আইটি সেল পরিচালনা করবে।
অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত মাত্র সাত মাসে ছয়জন মহাপরিচালক (ডিজি) দায়িত্ব পরিবর্তন করেছেন।
কেউ মাত্র ১৫ দিন, আবার কেউ দুই মাস দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফলে একজন ডিজি কোনো উদ্যোগ নেওয়ার পর নতুন ডিজি এসে আবার নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করেছেন। এতে ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়েছে এবং মেমিস প্রকল্প কার্যত দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে ছিল।
এর পাশাপাশি রাজস্ব খাতে অর্থসংকট এবং পুরোনো মেমিস সফটওয়্যারের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়াও প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্বের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, সফটওয়্যার তৈরি হয়ে গেলেও বাস্তবে শিক্ষক বদলি শুরু করা সহজ হবে না।
বর্তমানে এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসায় প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন।
তাদের মধ্যে অনেকের—
অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই মাসে জাল সনদের অভিযোগে ৪৪ জন শিক্ষকের এমপিও বাতিল করা হয়েছে।
এছাড়া আরও বহু শিক্ষকের বিষয়ে তদন্ত ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এসব সমস্যার কারণে শিক্ষকদের তথ্য যাচাই, ডেটা ইনপুট এবং ইএফটি প্ল্যাটফর্মে অন্তর্ভুক্তির কাজ সময়সাপেক্ষ হবে।
তাদের মতে, বর্তমান বাস্তবতায় আগামী ছয় মাসের মধ্যেও মাদ্রাসা শিক্ষকদের বদলি কার্যক্রম পুরোপুরি চালু হওয়া কঠিন হতে পারে।
এদিকে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ইতোমধ্যে নির্দেশনা দিয়েছে, ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার (ইএফটি) পদ্ধতিতে সরাসরি ব্যাংক হিসাবে বেতন-ভাতা পেতে হলে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে সব শিক্ষক-কর্মচারীকে নির্ধারিত ফরমে প্রয়োজনীয় তথ্য হালনাগাদ করতে হবে।
তবে এই তথ্য সংগ্রহ শুরু হওয়ার পর অনেক শিক্ষক বিভিন্ন তথ্যগত জটিলতায় পড়েছেন।
অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, অনেক শিক্ষক ইএফটিতে যুক্ত হতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন। কেউ কেউ ইএফটি কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করার অনুরোধও জানিয়েছেন।
অন্যদিকে, জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া এবং যাদের সনদ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঠিক রয়েছে, তারা ইএফটি ব্যবস্থাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করছেন।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক মো. আবুল কালাম তালুকদার বলেন, “নভেম্বর মাসের মধ্যে ইএফটি ও শিক্ষক বদলির মডিউল চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কনসালটেন্সি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি সম্পাদনের দিন থেকে তিন মাসের মধ্যে এই দুটি কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এজন্য আগস্টের শেষ অথবা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের মধ্যে টেন্ডারসহ প্রয়োজনীয় সব প্রক্রিয়া শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
তবে প্রকল্পের বর্তমান অগ্রগতি, টেন্ডার প্রক্রিয়ার সময়সাপেক্ষতা, সফটওয়্যার উন্নয়ন, শিক্ষক তথ্য যাচাই এবং এমপিও-সংক্রান্ত জটিলতা বিবেচনায় সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইএফটি ও শিক্ষক বদলি কার্যক্রম চালু করা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
Leave a Reply