প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের মৌখিক (ভাইভা) পরীক্ষা আয়োজনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় এখন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ পরীক্ষার স্বচ্ছতা নিয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা বিভাগকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বুধবার (২৪ জুন) সকালে রাজধানীর আজিমপুর সরকারি গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজ অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত আসন্ন এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং নকলমুক্ত পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, এনটিআরসিএর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের লিখিত পরীক্ষা তাঁর দায়িত্বে সম্পন্ন হয়েছে। লিখিত পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ও প্রার্থীদের একটি অংশ মানববন্ধনসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে অভিযোগ তোলে যে, পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে অনুষ্ঠিত হয়নি এবং উত্তরপত্র যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হয়নি। এসব অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে তিনি প্রশাসনিক তদন্তের উদ্যোগ নিয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা (ইন্টেলিজেন্স) বিভাগকে তদন্ত করে বিস্তারিত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সেটি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে। একই সঙ্গে তিনি জানান, এনটিআরসিএর অধীনে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের জন্য প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী বর্তমানে মৌখিক পরীক্ষার অপেক্ষায় রয়েছেন। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর তাদের ভাইভা আয়োজনের বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আপাতত শিক্ষা মন্ত্রণালয় তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছে।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা গত মে মাসের ১০ তারিখ থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে ঠিক তার আগেই এনটিআরসিএর তৎকালীন চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলামকে অন্যত্র বদলি করা হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিব রাজা আব্দুল হাইকে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হলেও তিনি এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। চেয়ারম্যান পদে এই পরিবর্তনের পর থেকেই মৌখিক পরীক্ষা আয়োজন নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং নির্ধারিত সময়েও ভাইভা শুরু করা সম্ভব হয়নি।
সভায় আসন্ন এইচএসসি পরীক্ষা প্রসঙ্গে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বর্তমানে আগের মতো প্রকাশ্যে নকলের প্রবণতা না থাকলেও নকলের কৌশল ও ধরন পরিবর্তিত হয়েছে। প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন নতুন পদ্ধতিতে অসাধু চক্র নকলের চেষ্টা করছে। এ কারণে পুরোনো ‘পরীক্ষা আইন’ সংশোধন করে বর্তমান সময়ের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা হয়েছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, নকল কিংবা প্রশ্নফাঁসের মতো অনিয়মের বিষয়ে সরকার কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। যারা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তিনি আরও বলেন, চলতি বছরের জুন মাসের মধ্যেই এসএসসির কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। এরপর প্রতিটি বিদ্যালয়ে নিয়ম অনুযায়ী প্রি-টেস্ট, টেস্ট পরীক্ষা এবং ইন-হাউস কোচিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। এ বিষয়ে শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠান পরিচালনা কমিটি বা গভর্নিং বডির সঙ্গে আলোচনা করে এসব কার্যক্রম যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীরা বোর্ড পরীক্ষার আগে পর্যাপ্ত প্রস্তুতির সুযোগ পায়।
অনুষ্ঠানে ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুধু একটি পাবলিক পরীক্ষা নয়; এটি শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন, অভিভাবকদের প্রত্যাশা এবং জাতির ভবিষ্যৎ নির্মাণের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। তাই সুষ্ঠু, সুন্দর, স্বচ্ছ ও নকলমুক্ত পরিবেশে এই পরীক্ষা আয়োজন করা সংশ্লিষ্ট সবার নৈতিক, প্রশাসনিক ও পেশাগত দায়িত্ব।
তিনি বলেন, একটি পাবলিক পরীক্ষার গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার ওপর। আর এই দায়িত্ব পালনে পরীক্ষা কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের আন্তরিকতা, সতর্কতা ও দায়িত্বশীলতার ওপর পরীক্ষার সামগ্রিক পরিবেশ অনেকাংশে নির্ভর করে।
পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার লক্ষ্যে চারটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে বোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, প্রথমত, প্রশ্নপত্রের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রশ্নপত্র পরিবহন, সংরক্ষণ এবং বিতরণের প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে, যাতে কোনোভাবেই প্রশ্নপত্রের গোপনীয়তা নষ্ট না হয় কিংবা কোনো ধরনের অনিয়মের সুযোগ সৃষ্টি না হয়।
দ্বিতীয়ত, প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রে অবশ্যই নকলমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী, শিক্ষক কিংবা অসাধু চক্র যেন পরীক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত করতে না পারে, সে বিষয়ে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক ও দায়িত্বশীল থাকতে হবে।
তৃতীয়ত, পরীক্ষা কেন্দ্রে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা ভয়, উদ্বেগ কিংবা অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ ছাড়াই স্বাচ্ছন্দ্যের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে। পরীক্ষার পরিবেশ যত বেশি শিক্ষার্থী-বান্ধব হবে, তারা তত বেশি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে নিজেদের সর্বোচ্চ মেধা ও যোগ্যতার প্রকাশ ঘটাতে সক্ষম হবে।
চতুর্থত, প্রতিটি পরীক্ষা কেন্দ্রকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্থানীয় প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় ও সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমেই একটি অবাধ, নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সফল এইচএসসি পরীক্ষা আয়োজন সম্ভব হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
Leave a Reply