বেসরকারি মাদ্রাসায় কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা এখনো মে মাসের বেতন-ভাতা হাতে পাননি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, চলতি জুন মাসেও তাদের বেতন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। আগামী ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেট থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পরই মে মাসের বেতন পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী ৮ জুলাইয়ের দিকে নতুন অর্থবছরের বাজেটের অর্থ পাওয়া যেতে পারে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বকেয়া বেতন পরিশোধের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের শুধু মে মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্যই প্রায় সাড়ে ৫০০ কোটি টাকার প্রয়োজন। এই অর্থ বরাদ্দের জন্য ইতোমধ্যে অর্থ বিভাগের সচিবের কাছে ডিও (ডেমি-অফিশিয়াল) লেটার পাঠানো হয়েছে। তবে চলতি ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে নতুন করে এই অর্থ ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ। ফলে নতুন অর্থবছরের বাজেট কার্যকর হওয়ার পর মে ও জুন—এই দুই মাসের বেতন একসঙ্গে পরিশোধের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন অর্থবছরের শুরুতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ ধাপে ধাপে বণ্টন করা হবে। জুলাই মাসের শুরু থেকেই এ প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। তবে বর্তমান অর্থবছর শেষ হওয়ার প্রাক্কালে অতিরিক্ত কোনো অর্থ ছাড় দেওয়ার পরিকল্পনা অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেই। এ কারণেই মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে বিলম্ব হচ্ছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, আগামী ৮ থেকে ১০ জুলাইয়ের মধ্যে বিভাগের জন্য নতুন বাজেটের অর্থ বরাদ্দ পাওয়া যেতে পারে। সেই অর্থ হাতে পেলেই মে ও জুন—দুই মাসের বেতন একসঙ্গে পরিশোধের প্রস্তুতি নেওয়া হবে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ১২ অথবা ১৩ জুলাইয়ের মধ্যে শিক্ষক-কর্মচারীরা একসঙ্গে দুই মাসের বেতন-ভাতা পেয়ে যাবেন। তবে ততদিন পর্যন্ত তাদের অপেক্ষা করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে দাখিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ৫ হাজার ৭৬৭টি, আলিম ১ হাজার ২৮৫টি, ফাজিল ৯৯৩টি এবং কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ১৮৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। অথচ এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারীর কেউই এখন পর্যন্ত মে মাসের বেতন-ভাতা পাননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, ঈদুল আজহার আগেই মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতনের বিল প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরিকল্পনা ছিল ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার আগেই সেই প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে পাঠানো হবে। কিন্তু সে সময় মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের (অতিরিক্ত দায়িত্ব) দায়িত্বে থাকা মো. উবায়দুল হক প্রস্তাবটি মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর অনুমতি দেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে বেতনের প্রস্তাব পাঠানো সম্ভব হয়নি।
পরবর্তীতে ঈদের ছুটি শেষে জুন মাসে আবারও বেতনের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। কিন্তু তখন কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ফান্ডে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় সেই প্রস্তাবও অনুমোদন দেওয়া হয়নি। ফলে বেতন-ভাতা পরিশোধের পুরো প্রক্রিয়াটি আটকে যায়।
সূত্রগুলো জানায়, প্রতি অর্থবছরের মতো এবারও জুন মাসের শুরুতে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ফান্ডে অবশিষ্ট থাকা অর্থ অর্থ মন্ত্রণালয় ফেরত নিয়ে যায়। এটি শুধু এই বিভাগের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রায় সব মন্ত্রণালয়ের ক্ষেত্রেই একই নিয়ম অনুসরণ করা হয়। অর্থবছর শেষ হওয়ার আগে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উদ্বৃত্ত অর্থ কেন্দ্রীয়ভাবে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে নতুন অর্থবছরের বাজেটে তা পুনর্বিন্যাস করা হয়। এই প্রক্রিয়ার কারণেই বর্তমানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের হাতে বেতন পরিশোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ নেই।
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তাদের পক্ষ থেকে ঈদের আগেই বেতনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছিল এবং তখনই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেটি সম্ভব না হওয়ায় পরবর্তীতে জটিলতা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, যদি ঈদের আগেই বেতনের প্রস্তাব পাঠানো যেত, তাহলে আজ শিক্ষক-কর্মচারীদের এমন দুর্ভোগে পড়তে হতো না। বর্তমানে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের ফান্ডে কোনো অর্থ নেই। অন্যদিকে নতুন বাজেট ঘোষণার পর চলতি অর্থবছরে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকেও অতিরিক্ত অর্থ ছাড় পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে জুন মাসে মে মাসের বেতন-ভাতা পাওয়ার সম্ভাবনা কার্যত নেই বলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন।
Leave a Reply