মে মাসের বেতন পাওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন দেশের এমপিওভুক্ত বেসরকারি মাদ্রাসাগুলোর প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক-কর্মচারী। সংশ্লিষ্ট বেতন খাতে পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ না থাকায় এখনো বেতন ছাড় করা সম্ভব হয়নি। ফলে নির্ধারিত সময় পার হলেও তারা মে মাসের বেতন হাতে পাননি। বেতন কবে ছাড় হবে কিংবা কবে শিক্ষক-কর্মচারীদের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছাবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরই এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট করে কিছু জানাতে পারেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রতি অর্থবছরে মূল বাজেটের পাশাপাশি বছরের মাঝামাঝি সময়ে একটি সম্পূরক বাজেট প্রণয়ন করা হয়, যার মাধ্যমে বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থের প্রয়োজন মেটানো হয়। তবে চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রয়োজনীয় অর্থের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়েছে। চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক অর্থ কম বরাদ্দ থাকায় বেতন পরিশোধে জটিলতা তৈরি হয়েছে এবং এর প্রভাব সরাসরি পড়েছে মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীদের ওপর।
জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবিলায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের বাজেট শাখা ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে একটি ডিও (ডেমি-অফিসিয়াল) লেটার পাঠিয়েছে। বেতন খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রেখেছেন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সমস্যা সমাধানে কাজ করছেন। তবে এখনো পর্যন্ত অর্থ ছাড়ের বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
প্রক্রিয়াগতভাবে প্রতি মাসে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের জন্য মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় অর্থের চাহিদাপত্র শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কারিগরি ও মাদ্রাসা বিভাগের বাজেট শাখায় পাঠিয়ে থাকে। এরপর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের কাছে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা ও অনুমোদনপত্র পাঠানো হয়। সেই অনুমোদন পাওয়ার পর মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর বেতন ছাড়ের নোটিশ জারি করে থাকে।
কিন্তু চলতি মাসের ৯ জুন সংশ্লিষ্ট কোডে প্রয়োজনীয় অর্থ না থাকায় বেতন ছাড় দেওয়া সম্ভব নয় বলে মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়। এর ফলে মে মাসের বেতন পরিশোধ নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, শিক্ষক-কর্মচারীরা আদৌ কবে বেতন পাবেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোনো দপ্তরই স্পষ্ট তথ্য দিতে পারছে না।
বেতন না পাওয়ার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কর্মরত এমপিওভুক্ত মাদ্রাসার শিক্ষক-কর্মচারীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। অনেকেই পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন বলে জানিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন পেলেও মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারীরা এখনো বেতন থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।
ভুক্তভোগী শিক্ষক-কর্মচারীরা বলেন, “দেশের অন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের বেতন পেয়েছেন। কিন্তু আমরা এখনো মে মাসের বেতন পাইনি। শিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকেও আমাদেরকে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য দেওয়া হচ্ছে না। বেতন না পাওয়ায় পরিবার পরিচালনা করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। অনেকেই ঋণ করে সংসার চালাচ্ছেন।”
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, শিক্ষক-কর্মচারীদের মে মাসের বেতন পরিশোধের বিষয়টি নিয়ে মন্ত্রণালয় কাজ করছে। প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড়ের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। তবে বেতন কবে নাগাদ দেওয়া সম্ভব হবে, সে বিষয়ে তিনি কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা উল্লেখ করতে পারেননি।
বিষয়টি নিয়ে মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) এবং যুগ্মসচিব মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন খান বলেন, “শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতনের বিষয়টি নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। তারা যেন দ্রুত বেতন পেতে পারেন, সে বিষয়ে আমরা কাজ করছি।”
মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ৮ হাজার ২২৯টি এমপিওভুক্ত মাদ্রাসা রয়েছে। এর মধ্যে দাখিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ৫ হাজার ৭৬৭টি, আলিম পর্যায়ের মাদ্রাসা ১ হাজার ২৮৫টি, ফাজিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ৯৯৩টি এবং কামিল পর্যায়ের মাদ্রাসা ১৮৪টি। এসব প্রতিষ্ঠানে প্রায় ১ লাখ ৯১ হাজার শিক্ষক ও কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। মে মাসের বেতন আটকে যাওয়ায় এই বিপুলসংখ্যক শিক্ষক-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার বর্তমানে অনিশ্চয়তা ও আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
Leave a Reply