দুই যুগ, তিন যুগ কিংবা তারও বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞানদান করে অবসরে গেছেন হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী। কর্মজীবনের পুরো সময়জুড়ে তারা নিয়মিতভাবে নিজেদের বেতন থেকে অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের জন্য অর্থ জমা দিয়েছেন, এই আশায় যে অবসরের পর সেই অর্থই হবে তাদের জীবনের শেষভাগের আর্থিক নিরাপত্তার প্রধান ভরসা। কিন্তু বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ ভিন্ন। অবসরে যাওয়ার পর প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার জন্য এখন তাদের অনেককেই বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। কেউ কেউ বারবার আবেদন করেও টাকা পাচ্ছেন না, আবার অনেকে টাকা পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলের বিপুল পরিমাণ অর্থ বর্তমানে বেসরকারি সাতটি ব্যাংকে আটকে রয়েছে। কোটি কোটি টাকার এই অর্থ ফেরত আনতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা উদ্যোগ নিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর সমাধান বের করতে পারেনি। ফলে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ এবং অনিশ্চয়তা দিন দিন বাড়ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, যেসব বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের অর্থ আটকে আছে, সেসব ব্যাংক থেকে টাকা আদায়ের জন্য পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। তবে কয়েকটি ব্যাংকে আর্থিক অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়েছে। তারপরও শিক্ষকদের কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত আনার ব্যাপারে সরকার কাজ করছে বলে জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন,
“শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের টাকা দিতে ইতোমধ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। এই কমিটি বিষয়টি নিয়ে কাজ করছে।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা বোর্ডের চেয়ারম্যান আবদুল খালেক জানিয়েছেন, অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের একটি বড় অঙ্কের অর্থ বর্তমানে সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে আটকে রয়েছে।
বিভিন্ন মিডিয়াকে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন,
“শিক্ষকদের অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্টের মোটা অঙ্কের টাকা সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে আটকে রয়েছে। এই টাকা আদায় করতে মন্ত্রণালয় অবশ্যই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে অবসর সুবিধা বোর্ডের তহবিলে রয়েছে ১ হাজার ৮২ কোটি টাকা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের তহবিলে রয়েছে প্রায় ৩৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই তহবিলে মোট জমা অর্থের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৪৩২ কোটি টাকা।
এর মধ্যে ৬৩৯ কোটি ৬০ লাখ ৬১ হাজার ৭২৫ টাকা সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে আটকে রয়েছে। অবশিষ্ট প্রায় ৮০০ কোটি টাকা রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক ও জনতা ব্যাংকে রাখা হয়েছে। সরকারি ব্যাংকগুলো থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থ উত্তোলনে কোনো সমস্যা না থাকলেও বেসরকারি ব্যাংকগুলো থেকে অর্থ ছাড় করাতে নানা জটিলতার মুখে পড়ছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানিয়েছে, নিম্নোক্ত সাতটি বেসরকারি ব্যাংকে শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ এফডিআর (ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্ট) এবং এসটিডি (শর্ট টার্ম ডিপোজিট) হিসেবে রাখা হয়েছিল—
এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অর্থ রাখা হয়েছিল ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে। শুধু এই ব্যাংকটিতেই শিক্ষকদের অবসর তহবিলের ২০০ কোটিরও বেশি টাকা জমা রয়েছে বলে জানা গেছে।
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক মুহম্মদ বদিউজ্জামান দিদার বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে কোনো চিঠি এসেছে কিনা এবং অবসর সুবিধা বোর্ডের হিসাব এখনও ব্যাংকে আছে কিনা তা যাচাই করে দেখতে হবে।
অন্যদিকে ইউনিয়ন ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা আবুল হাশেম বলেন, পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনায় জমাকৃত অর্থের একটি অংশ ভাগাভাগি হয়ে গেছে বলে শোনা যায় এবং তা কোনো উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ করা হয়নি। ফলে বর্তমানে অর্থ পরিশোধে জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তিনি আরও জানান, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক আমানতের অর্থ ধাপে ধাপে পরিশোধ করা হচ্ছে।
সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রশাসক মো. আবুল বাশার এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক মন্তব্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তিনি জানান, বিদেশ সফর শেষে দেশে ফিরে বিষয়টি নিয়ে কথা বলবেন।
সিটিজেনস ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলমগীর হোসেন বলেন,
“ডিপোজিটের টাকা দেওয়ার নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করা হলে আমরা অর্থ পরিশোধ করি। অবসর সুবিধা বোর্ডের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য হওয়ার কথা।”
বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা আইন, ২০০২-এর ধারা ৯(৪) এবং অবসর সুবিধা প্রবিধানমালা, ২০০৫-এর প্রবিধি ৬ অনুযায়ী অবসর সুবিধা বোর্ডের অর্থ সরকারি ব্যাংকে সংরক্ষণের বিধান রয়েছে।
কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, অধিক মুনাফার আশায় ওই বিধান উপেক্ষা করে তৎকালীন কর্মকর্তারা তুলনামূলক দুর্বল বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে শিক্ষকদের অর্থ জমা রেখেছিলেন।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, অবসর সুবিধা বোর্ডের সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ, বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেন এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন বি’-এর মালিক গোলাম সারোয়ার ও মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর যোগসাজশে এই অর্থ বেসরকারি ব্যাংকে স্থানান্তর করা হয়। অভিযোগ রয়েছে, অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের নামে তারা ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা নিয়েছিলেন।
সূত্র জানিয়েছে, অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ দীর্ঘ সাড়ে আট বছর অবসর সুবিধা বোর্ডের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এই সময়ে তার ভাতিজা মোফাজ্জল মওদুদ এলাহীর মালিকানাধীন সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিন বি’-কে বোর্ডের বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্টরা পরস্পরের সহযোগিতায় শত শত কোটি টাকার অনিয়ম ও তছরুপে জড়িত হন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, বিগত সরকারের আমলে অবসর ও কল্যাণ ট্রাস্টের বিপুল পরিমাণ অর্থ আওয়ামী লীগ ঘরানার ব্যক্তিদের মালিকানাধীন ব্যাংকে রাখা হয়েছিল।
তিনি বলেন,
“বর্তমানে এসব ব্যাংকে একসঙ্গে একাধিক শিক্ষকের টাকা দেওয়ার আবেদন পাঠানো হলেও তারা অর্থ ছাড় করতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে একজনের বেশি শিক্ষকের আবেদন গ্রহণ করতেও তারা অনিচ্ছুক।”
এদিকে অনিয়মের অভিযোগে অবসর বোর্ডের প্রোগ্রামার জামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে তার মোবাইল ফোন বন্ধ থাকায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে সাবেক সচিব অধ্যক্ষ শরীফ আহমদ ৫ আগস্টের পর থেকে পলাতক থাকায় তার বক্তব্যও নেওয়া সম্ভব হয়নি।
অবসর সুবিধা ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ না পাওয়ার কারণে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সাতক্ষীরার তালতলা আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সিরাজুল হক এর একটি মর্মান্তিক উদাহরণ।
তিনি ২০২৪ সালের ১ মে অবসরে যান এবং নিয়ম অনুযায়ী প্রাপ্য অর্থ পাওয়ার জন্য আবেদন করেন। কিন্তু দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও টাকা পাননি। অর্থ সংকটে পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে করতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এমন ঘটনা শুধু সিরাজুল হকের ক্ষেত্রেই নয়। হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী বছরের পর বছর আবেদন করে অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ অসুস্থ অবস্থায় চিকিৎসা করাতে পারছেন না, আবার কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করলেও তাদের পরিবারের হাতে এখনো প্রাপ্য অর্থ পৌঁছায়নি।
উচ্চ আদালত অবসরের ছয় মাসের মধ্যে প্রাপ্য অর্থ পরিশোধের নির্দেশনা দিলেও বাস্তবে তা অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
অবসর সুবিধা বোর্ড ও কল্যাণ ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, কল্যাণ সুবিধার অর্থ সর্বশেষ ২০২৩ সালের এপ্রিল পর্যন্ত আবেদনকারীদের দেওয়া হয়েছিল। এরপর থেকে নতুন আবেদনগুলো জমতে জমতে বিশাল আকার ধারণ করেছে।
গত ২৪ মে পর্যন্ত অবসর ও কল্যাণ সুবিধার জন্য মোট ৪৪ হাজার ৯৬৬ জন শিক্ষক-কর্মচারীর আবেদন অনিষ্পন্ন অবস্থায় রয়েছে।
এই বিপুল সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির জন্য নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
সূত্র জানিয়েছে, প্রথম ধাপে প্রায় ৮ হাজার শিক্ষককে আংশিকভাবে পাঁচ লাখ টাকা করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি প্রস্তাবও তৈরি করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত যাচাই-বাছাই সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ১০০ জনের আবেদন।
অন্যদিকে কল্যাণ সুবিধার অর্থ প্রদানের জন্য প্রায় সাড়ে তিন হাজার শিক্ষক-কর্মচারীর তালিকা প্রস্তুত রয়েছে। তবে চূড়ান্ত যাচাইয়ের পর সংখ্যায় কিছু পরিবর্তন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রাজধানীর এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় বিস্ফোরক অভিযোগ করেন যে, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেনশন তহবিলের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে।
এনইসি সভা শেষে তিনি বলেন, বিষয়টি সমাধানের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার পাঠানো হয়েছে। একইসঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বেশ কয়েকটি প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
অবসর ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ নিয়ে দীর্ঘদিনের এই সংকট এখন শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয় নয়; এটি হাজারো অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারীর জীবন-জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি মানবিক সংকটে পরিণত হয়েছে। জীবনের সেরা সময় শিক্ষাদানে উৎসর্গ করা এসব মানুষ এখন তাদের নিজস্ব কষ্টার্জিত অর্থ ফেরত পাওয়ার অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
Leave a Reply