বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ, সুপার এবং সহকারী সুপার পদে নিয়োগের জন্য অনুষ্ঠিত লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশের প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো মৌখিক পরীক্ষার কোনো তারিখ ঘোষণা করা হয়নি। এরই মধ্যে নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় নতুন করে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন সম্প্রতি বলেছেন, পরীক্ষায় অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে পুরো নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হতে পারে। মন্ত্রীর এমন বক্তব্যের পর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হাজারো প্রার্থীর মধ্যে উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে। ফলে এখন প্রশ্ন উঠেছে, সত্যিই কি প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের পথে যাচ্ছে?
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) একাধিক সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা গত ১০ মে থেকে শুরু হওয়ার কথা ছিল। মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও প্রায় সম্পন্ন করা হয়েছিল। তবে হঠাৎ করেই এনটিআরসিএর চেয়ারম্যান মো. আমিনুল ইসলামকে অন্যত্র বদলি করা হয়। পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিব রাজা আব্দুল হাইকে চেয়ারম্যান হিসেবে পদায়ন করা হলেও তিনি এখনো দায়িত্ব গ্রহণ করেননি। এর ফলে এনটিআরসিএতে প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি হয় এবং মৌখিক পরীক্ষা আয়োজনের প্রক্রিয়াও স্থবির হয়ে পড়ে। এরপর থেকেই ভাইভা পরীক্ষার সময়সূচি নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী মুহম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের মৌখিক পরীক্ষা কবে শুরু হবে, সেটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ই ভালো বলতে পারবে। আমি বর্তমানে কেবল রুটিন দায়িত্ব পালন করছি। ভাইভা পরীক্ষার বিষয়ে নির্দিষ্ট করে কিছু বলার সুযোগ নেই।’
বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান ও সহকারী প্রধান পদে নিয়োগ দিয়ে আসছিল সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ। কিন্তু এ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর ধরে স্বজনপ্রীতি, দলীয় প্রভাব, আর্থিক লেনদেন এবং নানা ধরনের অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমবারের মতো বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শীর্ষ প্রশাসনিক পদগুলোতে কেন্দ্রীয়ভাবে এনটিআরসিএর মাধ্যমে নিয়োগ দেওয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করে।
সরকারের এই সিদ্ধান্ত শিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক ইতিবাচক সাড়া ফেলে। শিক্ষক সমাজের বড় একটি অংশ মনে করেন, এর মাধ্যমে দীর্ঘদিনের নিয়োগ বাণিজ্য ও প্রভাব খাটানোর সংস্কৃতি বন্ধ হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। অনেকেই এটিকে অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম যুগান্তকারী উদ্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে গত ২৯ জানুয়ারি এনটিআরসিএ সারা দেশের ১৩ হাজার ৫৫৯টি প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান পদের জন্য প্রথম নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। ওই বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিষ্ঠানপ্রধান পদে আবেদন করতে ন্যূনতম ১৫ বছরের এবং সহকারী প্রধান পদে আবেদন করতে ১২ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়।
কিন্তু পরবর্তীতে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে শিক্ষক সংগঠনগুলোর দাবির মুখে নিয়োগের যোগ্যতায় পরিবর্তন আনা হয়। বিশেষ করে কুমিল্লা-২ আসনের সংসদ সদস্য ও বাংলাদেশ শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের নেতা অধ্যক্ষ সেলিম ভূঁইয়ার দাবির প্রেক্ষিতে এমপিও নীতিমালায় সংশোধন আনা হয়। এর ধারাবাহিকতায় গত ১০ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সংশোধিত এমপিও নীতিমালা জারি করে।
সংশোধিত নীতিমালা অনুযায়ী প্রতিষ্ঠানপ্রধান এবং সহকারী প্রধান—উভয় পদেই আবেদন করতে ন্যূনতম ১৮ বছরের অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক করা হয়। নতুন এ শর্তের কারণে আগের বিজ্ঞপ্তির আওতায় আবেদন করা বহু প্রার্থী অযোগ্য হয়ে পড়েন। ফলে জানুয়ারিতে প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বাতিল করতে বাধ্য হয় এনটিআরসিএ।
পরে নতুন করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়, যেখানে শূন্য পদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয় ১২ হাজার ৯৫১টি। নতুন বিজ্ঞপ্তির আলোকে গত ১৮ এপ্রিল রাজধানীর ৯টি কেন্দ্রে চার শিফটে লিখিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। পরীক্ষা শেষ হওয়ার মাত্র চার দিনের মাথায়, অর্থাৎ ২২ এপ্রিল, এনটিআরসিএ এমসিকিউ পরীক্ষার ফল প্রকাশ করে, যা ছিল রেকর্ড সময়ের মধ্যে ফল প্রকাশের ঘটনা।
প্রকাশিত ফলাফল অনুযায়ী, পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী ৪৮ হাজার ১৪৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ১৪ হাজার ৯৪২ জন উত্তীর্ণ হন। উত্তীর্ণ এসব প্রার্থীর মৌখিক পরীক্ষা ১০ মে থেকে শুরু হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও নানা কারণে তা আর অনুষ্ঠিত হয়নি। ফলে বর্তমানে ১৪ হাজারেরও বেশি প্রার্থী অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
সম্প্রতি এ বিষয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ পরীক্ষা নিয়ে কিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগ তদন্তের জন্য একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে পুরো নিয়োগ কার্যক্রম বাতিল করা হবে।
তবে মন্ত্রীর এই বক্তব্যের পর নতুন প্রশ্নের জন্ম হয়েছে। কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনটিআরসিএর একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এ ধরনের কোনো তদন্ত কমিটি গঠনের বিষয়ে অবগত নন। এমনকি পরীক্ষায় কী ধরনের অনিয়ম হয়েছে, সে বিষয়েও তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং এনটিআরসিএর মোট ছয়জন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত তাদের কাছে তদন্ত কমিটি গঠনের কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা নির্দেশনা পৌঁছেনি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিষ্ঠান প্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগ পরীক্ষার অনিয়ম তদন্তে এখনো কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি। এ ধরনের কোনো কাগজপত্রও আমাদের কাছে আসেনি। যদি এ ধরনের কোনো নির্দেশনা আসে, তখন বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত বলা সম্ভব হবে।’
অন্যদিকে এনটিআরসিএর চেয়ারম্যানের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনকারী মুহম্মদ নূরে আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ পরীক্ষা আমরা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করেছি। পরীক্ষার কেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল। অনিয়ম বা জালিয়াতির বিষয়ে কী অভিযোগ উঠেছে, তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী এবং শিক্ষা সচিবই ভালো বলতে পারবেন।’
এ বিষয়ে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলনের বক্তব্য নেওয়ার জন্য তার দপ্তরে যোগাযোগ করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। পরে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দেওয়া হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে তদন্ত কমিটি, অভিযোগের প্রকৃতি এবং নিয়োগ কার্যক্রমের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও সহকারী প্রধান নিয়োগের এই প্রক্রিয়া বর্তমানে অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। একদিকে মৌখিক পরীক্ষার তারিখ ঘোষণা না হওয়া, অন্যদিকে নিয়োগ পরীক্ষা বাতিলের সম্ভাবনা নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য—দুইয়ের মধ্যে পড়ে উৎকণ্ঠায় রয়েছেন লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ প্রায় ১৫ হাজার প্রার্থী। এখন সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরবর্তী সিদ্ধান্ত এবং এনটিআরসিএর আনুষ্ঠানিক ঘোষণার দিকে।
Leave a Reply