শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেছেন, দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া থাকা এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবসর সুবিধা ও কল্যাণ ট্রাস্টের অর্থ পরিশোধ কার্যক্রম আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু করা হবে। একই সঙ্গে চলতি বছরের মধ্যে শিক্ষকদের সব বকেয়া অর্থ পরিশোধেরও সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো হবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে শিক্ষকদের জন্য অবসর ভাতা এবং কল্যাণ ট্রাস্টের সুবিধা চালু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২২ সালের পর থেকে একজন শিক্ষকও কল্যাণ ট্রাস্ট কিংবা অবসর ভাতার অর্থ পাননি। ফলে হাজার হাজার শিক্ষক অবসর গ্রহণের পরও তাদের প্রাপ্য অর্থের জন্য অপেক্ষা করছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, শিক্ষকদের প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এ কারণে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন।
শিক্ষামন্ত্রী বলেন, “আমি প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি তুলে ধরেছি। তিনি শিক্ষকদের পাওনা পরিশোধের জন্য ২ হাজার কোটি টাকার বিশেষ থোক বরাদ্দ দিয়েছেন। আমরা আগামী জুলাই মাস থেকে এই অর্থ বিতরণ কার্যক্রম শুরু করব। দীর্ঘদিন ধরে যারা অপেক্ষা করছেন, তাদের পাওনা ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “অনেক শিক্ষক রয়েছেন যারা অবসর গ্রহণের পর হজে যেতে পারছেন না, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না। অনেকেই তাদের সন্তানদের ওপর বোঝা হতে চান না। তারা অত্যন্ত কষ্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের এই দুর্ভোগ লাঘব করতেই সরকার দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে।”
ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন বলেন, দায়িত্ব গ্রহণের পর গত তিন মাসে সরকার হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি। শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে ধারাবাহিকভাবে কাজ করা হয়েছে। জুলাই মাস থেকে তাদের পাওনা অর্থ পরিশোধ শুরু হবে এবং চলতি বছরের মধ্যেই যতটা সম্ভব বকেয়া নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, বছরের মধ্যেই আমরা পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক করতে পারব এবং শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।”
সাক্ষাৎকারে শিক্ষকদের রাজনীতি নিয়েও কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী। তিনি বলেন, শিক্ষকদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি হঠাৎ করে কোনো মন্তব্য করতে চান না। তবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি সুস্থ ও ইতিবাচক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার ওপর সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা চাই শিক্ষকতায় মেধাবীরা আসুক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেপোটিজম ও ফেভারিটিজমের সংস্কৃতি দূর হোক। একজন শিক্ষকের রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে তার যোগ্যতা ম্লান হয়ে যাবে বা মূল্যায়ন বাধাগ্রস্ত হবে—এটা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।”
শিক্ষামন্ত্রী আরও বলেন, শিক্ষকদের লেজুরভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। তাদের রাজনীতি হওয়া উচিত শিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রিক। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে গবেষণার উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন, বাজেট বৃদ্ধি এবং একাডেমিক পরিবেশের উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা ও মতপ্রকাশকে তিনি ইতিবাচক রাজনীতি হিসেবে দেখেন।
তিনি বলেন, “রাজনীতি যদি বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক হয় এবং শিক্ষা ও গবেষণার উন্নয়নের প্রশ্নে পরিচালিত হয়, তাহলে তা দেশের জন্য কল্যাণকর হবে। কিন্তু দলীয় লেজুরবৃত্তির রাজনীতি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য কোনো সুফল বয়ে আনে না।”
বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকার যোগ্যতা ও মেধার ভিত্তিতে শিক্ষক এবং উপাচার্য (ভিসি) নিয়োগ দেওয়ার নীতি অনুসরণ করছে। যাদের প্রয়োজনীয় মেধা, দক্ষতা ও যোগ্যতা রয়েছে, তাদেরই গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “আমরা মেধাবী ব্যক্তিদের শিক্ষকতা পেশায় আনতে চাই। একইভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বেও যোগ্য ও দক্ষ ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাতে উচ্চশিক্ষার মান আরও উন্নত করা যায়।”
Leave a Reply