আসছে বহুল প্রতীক্ষিত নতুন পে-স্কেল। আগামী ১ জুলাই থেকেই এটি বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে সরকার। সর্বশেষ বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে এ বিষয়ে অনেকটাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। একই সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত হওয়ার পর শিক্ষকদের বেতন নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে প্রাথমিক শিক্ষক এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন পে-স্কেল ঘিরে তৈরি হয়েছে প্রত্যাশা ও উদ্বেগ—দুই-ই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকারি বেতন কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতনে বড় ধরনের বৃদ্ধি আসতে পারে। বর্তমানে ১৩তম গ্রেডভুক্ত শিক্ষকদের যে মূল বেতন ১১ হাজার টাকা রয়েছে, সেটি প্রায় দ্বিগুণ করার প্রস্তাব আলোচনা পর্যায়ে রয়েছে। এছাড়া নতুন পে-স্কেলে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের ওপর। নিম্নস্তরের এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখার পাশাপাশি টিফিন ভাতা, বাড়িভাড়া ভাতা এবং অন্যান্য আর্থিক সুবিধাও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।
অন্যদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে—নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে তারা আদৌ নতুন হারে বেতন-ভাতার সুবিধা পাবেন কি না, তা নিয়ে। দেশের কয়েক লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে এ নিয়ে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। তবে এ বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং পে কমিশনের একাধিক সদস্যের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিদ্যমান সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় যারা সরকারের কাছ থেকে বেতন গ্রহণ করেন, নতুন পে-স্কেল অনুমোদিত হলে তারাও নতুন কাঠামোর আওতায় আসবেন। অর্থাৎ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরাও নতুন স্কেলের সুবিধা থেকে বাদ পড়বেন না বলেই ইঙ্গিত মিলেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নতুন পে-স্কেল কার্যকর হলে শুধু মূল বেতনই নয়, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ভাতা ও সুযোগ-সুবিধাও সমন্বয় করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একজন অতিরিক্ত সচিব বলেন, “সরকারি বেতন কাঠামোর আওতায় যারা সরকারের কাছ থেকে বেতন পান, নতুন পে-স্কেল অনুমোদিত হলে তাদের সবাইকেই সেই নতুন কাঠামো অনুযায়ী বেতন দেওয়া হবে। এতে কোনো ধরনের বৈষম্যের সুযোগ নেই।”
তিনি আরও জানান, নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্ত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সরকার এমন একটি পে-স্কেল বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আর্থিক সক্ষমতার বিষয়গুলো গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রশাসনের দায়িত্বশীল দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়িত হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মূল বেতন বৃদ্ধি পাওয়া প্রায় নিশ্চিত। আর মূল বেতন বাড়লে বাড়িভাড়া ভাতাও বাড়বে। বর্তমানে যে সাড়ে ৭ শতাংশ হারে বাড়িভাড়া দেওয়া হয়, সেটি বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করার সম্ভাবনাই বেশি বলে প্রাথমিক আলোচনায় উঠে এসেছে। তবে চিকিৎসা ভাতা আপাতত অপরিবর্তিত থাকতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। যদিও সবকিছুই নির্ভর করছে চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের ওপর।
এদিকে এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব এবং বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষক-কর্মচারী ফোরামের সভাপতি অধ্যক্ষ মাওলানা দেলোয়ার হোসেন আজিজি এ বিষয়ে বলেন, সরকার যেহেতু ইতোমধ্যে বেতন কমিশন গঠন করেছে এবং এর কার্যক্রম এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাই তারা আশা করছেন খুব দ্রুতই এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে।
তিনি বলেন, “গত এক দশকে আমরা কার্যত একটি পে-স্কেল থেকে বঞ্চিত হয়েছি। সরকার চাইলে এই সময়ের মধ্যে দুটি পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা সম্ভব ছিল। তাই অতীতের সেই বঞ্চনার পুনরাবৃত্তি যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল অবশ্যই সচেতন থাকবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপ। দীর্ঘদিন ধরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এই আর্থিক চাপ মোকাবিলায় হিমশিম খাচ্ছেন। সেই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই সরকারের উচ্চপর্যায়ের কমিটি নবম পে-স্কেল দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করছে।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে নবম পে-স্কেলের বিভিন্ন কারিগরি ও নীতিগত দিক নিয়ে বিশদ আলোচনা হয়। এ সময় সুপারিশ প্রণয়ন এবং কাঠামোগত বিশ্লেষণের দায়িত্বে থাকা তিনটি পৃথক বিশেষ কমিটি তাদের প্রস্তুত করা প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। এসব প্রতিবেদনে নতুন বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস, ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা সমন্বয়, পদভিত্তিক বৈষম্য নিরসন এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি কার্যকর বেতন কাঠামো তৈরির নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।
উপস্থাপিত তিনটি প্রতিবেদনের মধ্যে দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষ হয়েছে। বিশেষ করে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পরিমাণ এবং সেটি জাতীয় বাজেটের সঙ্গে কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ রাখা যায়—সে বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়েছে। তৃতীয় প্রতিবেদনটি পরবর্তী বৈঠকে আলোচনার জন্য রাখা হয়েছে।
এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ এবং দেশের সামগ্রিক আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার এককালীন পুরো পে-স্কেল বাস্তবায়নের পরিবর্তে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মোট তিন ধাপে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়ন করা হবে।
প্রথম ধাপে আগামী অর্থবছর থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে। দ্বিতীয় বছরে বাকি ৫০ শতাংশ মূল বেতন সমন্বয় করা হবে। আর তৃতীয় ও চূড়ান্ত ধাপে সব ধরনের ভাতা এবং আনুষঙ্গিক সুবিধা পুরোপুরি চালু করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলের সব ধরনের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে আরও কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। সে কারণে আগস্ট কিংবা সেপ্টেম্বর মাসে গেজেট প্রকাশ হলেও সরকারি কর্মচারীদের আর্থিক ক্ষতি হবে না। কারণ গেজেট প্রকাশের পর আগামী ১ জুলাই থেকে কার্যকর হিসাব করে বর্ধিত বেতনের বকেয়া বা এরিয়ারও প্রদান করা হবে।
সার্বিক বিষয়ে অর্থ বিভাগের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ও জীবনযাত্রার মান যেমন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে, ঠিক তেমনি সরকারের সামগ্রিক রাজস্ব সক্ষমতার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রেখে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে।”
Leave a Reply