নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে গঠিত সচিব কমিটির গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২১ মে) সকাল ১১টায় সচিবালয়ে শুরু হওয়া এ বৈঠক দুপুরে শেষ হয়। তবে বৈঠকে কী কী সিদ্ধান্ত হয়েছে, সে বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানানো হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বৈঠকে মূলত নতুন বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব, বিভিন্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার, পেনশন সুবিধা এবং বাস্তবায়নের ধাপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সচিব কমিটির সঙ্গে যুক্ত দায়িত্বশীল কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে, নতুন পে-স্কেলে নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন এবং সুযোগ-সুবিধা তুলনামূলক বেশি বাড়ানোর বিষয়ে নীতিগত আলোচনা হয়েছে। অন্যদিকে উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বেতন বাড়লেও তা অপেক্ষাকৃত সীমিত রাখা হতে পারে। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, বর্তমান মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় চাপ পড়ছে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর। ফলে নতুন কাঠামোতে তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় এনে বেশি সুবিধা দেওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
কমিটির দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে দীর্ঘদিনের বেতন বৈষম্য কমিয়ে আনার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। বর্তমানে নিচের গ্রেড ও উপরের গ্রেডের বেতনের ব্যবধান অনেক বেশি। নতুন পে-স্কেলে সেই ব্যবধান কিছুটা কমানোর চিন্তা রয়েছে। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
একইসঙ্গে সরকারি পেনশনভোগীদের জন্যও বড় ধরনের সুবিধা বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, পেনশনের হার শতভাগ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব আলোচনায় রয়েছে। যারা বর্তমানে মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশন প্রায় দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়তে পারে। ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকার মধ্যে পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রায় ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। আর যাদের মাসিক পেনশন ৪০ হাজার টাকার বেশি, তাদের জন্য প্রায় ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করা হয়েছে।
পে-কমিশনের দায়িত্বশীল সূত্রগুলো জানিয়েছে, কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ একবারে বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ৪৩ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতো। তবে বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যে ১০ শতাংশ মহার্ঘ ভাতা পাচ্ছেন, সেটিকে নতুন বেতন কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ কিছুটা কমে প্রায় ৩৭ হাজার কোটি টাকায় নেমে এসেছে। সেই হিসাব বিবেচনায় নিয়েই আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ রাখার প্রস্তাব করা হচ্ছে।
জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে সচিবালয়ে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে পৃথক দুটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবম জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়, শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ প্রশাসন, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সরকারি ব্যবস্থাপনার প্রায় সব শ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী অন্তর্ভুক্ত থাকবেন।
এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের ক্ষেত্রেও নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের নির্দেশনা থাকতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও হয়নি। সচিব কমিটির সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন জারি করবে। এরপরই নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সোমবার (১৮ মে) নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বর্তমানে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও কাঙ্ক্ষিত নয়। ফলে বাজেটে অনেক খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। তারপরও সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আগামী ১ জুলাই থেকেই নবম জাতীয় পে-স্কেল কার্যকর করতে ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী বলে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে। তবে বেতন কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হচ্ছে না। সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় কিছু সুপারিশ ধাপে ধাপে কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়নের পরিবর্তে তিন ধাপে বাস্তবায়নের দিকেই এগোচ্ছে সরকার। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি-র নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী আগামী তিন অর্থবছরে ধাপে ধাপে নতুন সুবিধা কার্যকর হতে পারে। যদিও এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনও আসেনি।
এদিকে নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরির বিদ্যমান ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে নিচের স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘ প্রায় এক দশক পর নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে কিছুটা স্বস্তি আসবে। একইসঙ্গে পেনশনভোগীরাও বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা পেতে পারেন। এখন সবার নজর প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন এবং আগামী বাজেটে এ খাতে কত বরাদ্দ রাখা হয়, সেদিকেই।
Leave a Reply