আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের ঘোষণা দিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এদিকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটি আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২১ মে) আবারও বৈঠকে বসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই বৈঠক থেকেই পে-স্কেল বাস্তবায়নের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসতে পারে।
পে-স্কেল সংক্রান্ত কমিটির সঙ্গে যুক্ত একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, নতুন কাঠামোয় নিম্ন ও মধ্যম স্তরের সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য তুলনামূলক বেশি বেতন ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির প্রস্তাব রাখা হয়েছে। অন্যদিকে উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা তুলনামূলক কম হারে সুবিধা পেতে পারেন। একই সঙ্গে সরকারি পেনশনভোগীদের ক্ষেত্রেও বড় ধরনের সুবিধা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, অনেক ক্ষেত্রে পেনশনের হার শতভাগেরও বেশি বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
পে-স্কেল সংশ্লিষ্ট কমিটির এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ সবচেয়ে বেশি পড়ায় তাদের বেতন বৃদ্ধির হার নতুন কাঠামোয় তুলনামূলক বেশি রাখার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে দীর্ঘদিনের বৈষম্য কমিয়ে আনার বিষয়েও সুপারিশ থাকতে পারে বলে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন। বিশেষ করে মাঠ প্রশাসন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের কর্মচারীদের সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান-এর সঙ্গে সচিবালয়ে গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে নতুন জাতীয় বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। নবম জাতীয় পে-স্কেলের আওতায় শুধু প্রশাসন ক্যাডার নয়, শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, বিচার বিভাগীয় কর্মচারীসহ সরকারি বিভিন্ন খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানা গেছে।
এছাড়া স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে কর্মরতদের ক্ষেত্রেও আলাদা নির্দেশনা থাকতে পারে বলে আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে কমিটির সুপারিশ অনুমোদনের পর। জানা গেছে, পুনর্গঠিত কমিটির বৈঠকে সুপারিশ চূড়ান্ত হওয়ার পর তা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রী অনুমোদন দিলে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হবে। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন শুরু হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী সোমবার (১৮ মে) নিজ কার্যালয়ে গণমাধ্যমকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, “আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই অর্থাৎ ১ জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়ন করা হবে। তবে দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এখন চ্যালেঞ্জিং। জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আদায়ের অবস্থাও সন্তোষজনক নয়। ফলে অনেক খাতে কাটছাঁট করতে হচ্ছে। সেই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও নতুন বেতনকাঠামোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।”
সরকারি সূত্রে আরও জানা গেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দিয়েছেন। তবে বেতন কমিশনের সব সুপারিশ একসঙ্গে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র।
সূত্রগুলো বলছে, কমিশনের সুপারিশ আংশিক কাটছাঁট করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ লক্ষ্যে তিন ধাপে নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনি-এর নেতৃত্বাধীন কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী তিন অর্থবছরে বাস্তবায়নের বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, “কমিটির সুপারিশ ছিল। কিন্তু আমাদের বাজেটের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আমরা এখন কঠিন আর্থিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।”
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে যাচ্ছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন ও পেনশন বৃদ্ধির বিষয়টি বাস্তবায়িত হলে তা মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলায় কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।
Leave a Reply