সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। প্রায় এক যুগ পর নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার লক্ষ্যে সরকার নীতিগতভাবে অগ্রসর হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকেই নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আসন্ন জাতীয় বাজেটেই নতুন পে-স্কেলের জন্য প্রাথমিক বরাদ্দ রাখা হতে পারে। তবে একবারে পুরো কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন না করে ধাপে ধাপে তা কার্যকর করার দিকেই এগোচ্ছে সরকার।
জানা গেছে, নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকার একটি তিন ধাপের কৌশল গ্রহণ করেছে। কারণ কমিশনের পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়ন করতে গেলে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাব অনুযায়ী, শুধু বেতন কাঠামো বাস্তবায়নেই অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এর সঙ্গে পেনশন খাতে আরও প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা যুক্ত হলে মোট অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। এমন বিশাল অঙ্কের আর্থিক চাপ একবারে বহন করা সরকারের পক্ষে কঠিন হওয়ায় ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকার সম্ভাব্য বরাদ্দ রাখা হতে পারে বলে আলোচনা চলছে। এই ধাপে সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বিচার বিভাগ এবং বিভিন্ন বাহিনীর চাকরিজীবীদের মূল বেতনের একটি অংশ বৃদ্ধি করা হবে। প্রাথমিকভাবে বেসিক বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তি সুবিধা কার্যকর হতে পারে বলে জানা গেছে। এরপর দ্বিতীয় ধাপে ২০২৭-২৮ অর্থবছরে বাকি ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন করা হবে। আর তৃতীয় ধাপে ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, বৈশাখী ভাতা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা শতভাগ কার্যকর করা হতে পারে।
সরকারের নীতিনির্ধারক মহল মনে করছে, এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন কৌশল দেশের অর্থনীতির জন্য তুলনামূলক নিরাপদ হবে। কারণ একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে প্রবাহিত হলে মূল্যস্ফীতির ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হতে পারে। বর্তমানে দেশের বাজার পরিস্থিতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েই সরকার সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ধীরে ধীরে বেতন বৃদ্ধি করলে সরকারের নগদ অর্থ ব্যবস্থাপনাও সহজ হবে এবং একই সঙ্গে বাজারেও অতিরিক্ত চাপ তৈরি হবে না।
এদিকে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। কমিশনের সুপারিশে বলা হয়, বর্তমান ২০তম গ্রেডের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা উচিত। অন্যদিকে সর্বোচ্চ গ্রেডের মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কমিশনের যুক্তি ছিল, বর্তমান বাজারদর, জীবনযাত্রার ব্যয় ও মুদ্রাস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হলে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা জরুরি।
তবে পরে সরকারের গঠিত সচিব কমিটি কমিশনের অনেক সুপারিশ কাটছাঁট করে সীমিত আকারে বাস্তবায়নের পক্ষে মত দেয়। বিশেষ করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কুক, মালি, গাড়ি ও অন্যান্য বিশেষ সুবিধা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি ব্যয় কমানোর জন্য কিছু ভাতা ও সুবিধা আংশিক সংশোধনের কথাও বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, এসব কাটছাঁটের ফলে সরকারের অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকা পর্যন্ত কমে আসতে পারে এবং মোট ব্যয় ৯০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব হতে পারে।
নতুন পে-স্কেলে সরকারি চাকরির বর্তমান ২০টি গ্রেডই বহাল রাখা হচ্ছে। তবে গ্রেডভিত্তিক বেতন কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার সুপারিশ রয়েছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন বৃদ্ধির হার তুলনামূলক বেশি রাখা হয়েছে যাতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় সামাল দিতে পারেন। একই সঙ্গে বাড়ি ভাড়া ও অন্যান্য ভাতার ক্ষেত্রেও নিচের গ্রেডগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আলোচনা রয়েছে।
পেনশন সুবিধাতেও বড় ধরনের পরিবর্তনের সুপারিশ করা হয়েছে। জানা গেছে, মাসিক ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান এমন অবসরপ্রাপ্তদের পেনশন ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হতে পারে। ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত পেনশনভোগীরা ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারেন। আর এর বেশি পেনশন পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রস্তাব রয়েছে। বয়সভিত্তিক অতিরিক্ত সুবিধার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। ৭৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনভোগীদের জন্য অতিরিক্ত ১০ হাজার টাকা, ৫৫ থেকে ৭৪ বছর বয়সীদের জন্য ৮ হাজার টাকা এবং ৫৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য ৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত সুবিধার সুপারিশ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও মানবিক বিষয়ক সুবিধাও বাড়ানোর প্রস্তাব এসেছে। প্রতিবন্ধী সন্তান থাকলে মাসিক ২ হাজার টাকা ভাতা দেওয়ার সুপারিশ রয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। যাতায়াত ভাতাও ১০ম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত বিস্তৃত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে যাতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা কিছুটা স্বস্তি পান।
সামরিক বাহিনী ও বিচার বিভাগের জন্য পৃথক বেতন কাঠামো নিয়েও আলাদা কমিশনের কাজ প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে। এসব খাতের চাকরিজীবীদের জন্য কিছু বিশেষ সুবিধা সংযোজনের আলোচনা চলছে। পাশাপাশি বাড়ি ভাড়ার ক্ষেত্রে প্রথম থেকে দশম গ্রেড পর্যন্ত তুলনামূলক কম হার এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডে বেশি হারে সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এতসব আলোচনা ও প্রস্তুতির মধ্যেও সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখনও নানা ধরনের সংশয় ও প্রশ্ন রয়ে গেছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—পে-স্কেল বাস্তবে ঠিক কবে থেকে কার্যকর হবে। যদিও বলা হচ্ছে আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হবে, কিন্তু জুলাই থেকেই কার্যকর হবে নাকি পরে কোনো সময়ে তা শুরু হবে—এ বিষয়ে এখনও স্পষ্ট ঘোষণা আসেনি। একইভাবে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ মূল বেতন শেষ পর্যন্ত কত নির্ধারণ করা হবে, সেটিও নিশ্চিত নয়। বিভিন্ন মাধ্যমে কমিশনের সুপারিশকৃত কাঠামোর তথ্য সামনে এলেও বাস্তবায়নযোগ্য চূড়ান্ত কাঠামো নিয়ে সরকার এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।
এ কারণে সাধারণ চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ তৈরি হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, বাজেটে বরাদ্দের অজুহাতে বাস্তবায়ন আরও পিছিয়ে যেতে পারে। অতীতেও বিভিন্ন সময় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যাওয়ায় চাকরিজীবীদের একাংশ এখনো পুরো বিষয়টি নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারছেন না। ফলে নবম জাতীয় পে-স্কেল ঘিরে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে যেমন আশার সঞ্চার হয়েছে, তেমনি বাস্তবায়নের সময় ও চূড়ান্ত সুবিধা নিয়ে রয়ে গেছে বড় ধরনের ধোঁয়াশা।
Leave a Reply