কাগজ ও কালি সংকটের কারণে আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে বাংলাদেশ ব্যাংকের চাহিদা অনুযায়ী নতুন নোট সরবরাহ করতে পারছে না রাষ্ট্রীয় টাকশাল। প্রতি বছর ঈদের আগে নতুন টাকার চাহিদা ব্যাপকভাবে বেড়ে গেলেও চলতি বছর পরিস্থিতি ভিন্ন। বাংলাদেশ ব্যাংক যেখানে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার নতুন নোট চেয়েছে, সেখানে টাকশাল সর্বোচ্চ ৮ হাজার কোটি টাকার নোট সরবরাহ করতে পারবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। ফলে চাহিদা ও জোগানের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটি প্রিন্টিং করপোরেশনের গুদামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছবিযুক্ত পুরোনো নকশার প্রায় ১৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকার নোট মজুত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চাইলে মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই এসব নোট বাজারে ছাড়া সম্ভব। তবে আপাতত বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত পুরোনো ডিজাইনের নোট বাজারে না ছাড়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। বৃহস্পতিবার (১৪ মে) দৈনিক সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমানে যে সংকট তৈরি হয়েছে, সেটিকে কোনোভাবেই তারল্য সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ ব্যাংকিং খাতে মোট সঞ্চয়ের পরিমাণ এখন প্রায় ২৪ লাখ কোটি টাকা। মূল সমস্যা হচ্ছে ছাপানো টাকার সরবরাহে। দেশে বর্তমানে বাজারে প্রচলনের জন্য ছাপানো টাকার চাহিদা রয়েছে প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার কোটি থেকে ৩ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে। প্রতিবছর দুই ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন নোটের চাহিদা স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়। বিশেষ করে কোরবানির ঈদে পশু কেনাবেচা, কাঁচাবাজার, পরিবহনসহ নগদ লেনদেনের পরিমাণ বেশি হওয়ায় নতুন নোটের ব্যবহারও বৃদ্ধি পায়। এ কারণে প্রতি বছর এ সময় বিপুল পরিমাণ নতুন নোট বাজারে ছাড়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের নোট ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বঙ্গবন্ধুর ছবিযুক্ত প্রচলিত নোটের পরিবর্তে একযোগে নতুন নকশার নোট বাজারে আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলছেন, সাধারণত একটি নতুন নোটের নকশা চূড়ান্ত করা, নিরাপত্তা বৈশিষ্ট্য সংযোজন, কাগজ ও কালি সংগ্রহ, পরীক্ষামূলক ছাপানো এবং বাজারজাতকরণের পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ১০ থেকে ১৮ মাস পর্যন্ত সময় লাগে।
অতীতে নোটের নকশা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে ধাপে ধাপে একটি মূল্যমানের পর আরেকটি মূল্যমানের নোট বাজারে আনা হতো। কিন্তু এবার বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিস্থিতির কারণে সব মূল্যমানের নোট একসঙ্গে নতুন ডিজাইনে বাজারে ছাড়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে পুরোনো নকশার নোট দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে ছাড়া বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে বাজারে নতুন নোটের সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং চাহিদার সঙ্গে জোগানের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো আরও জানিয়েছে, গত দুই ঈদেই বাজারে নতুন নোট ছাড়া সম্ভব হয়নি। ফলে মানুষের মধ্যে নতুন নোটের চাহিদা জমে ছিল। এবার ঈদ সামনে রেখে সেই চাহিদা আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। কিন্তু কাগজ ও বিশেষ ধরনের নিরাপত্তা কালি আমদানিতে জটিলতা, উৎপাদন সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং নতুন নকশার নোট চালুর দীর্ঘ প্রক্রিয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে আসন্ন ঈদেও প্রত্যাশিত পরিমাণ নতুন নোট হাতে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা।
Leave a Reply