সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়ে সরকার ইতোমধ্যে এগোতে শুরু করেছে। এ লক্ষ্যে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার একটি প্রাথমিক পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, পে-কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পূর্ণমাত্রায় বেতন বৃদ্ধি নাও হতে পারে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—বাস্তবে কত শতাংশ বেতন বৃদ্ধি পেতে পারেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
এ বিষয়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির এক নেতা জানান, বর্তমানে ২০তম গ্রেডের কর্মচারীদের বেতন স্কেল ৮২৫০ টাকা। এই বেতনের ওপর যদি ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা দাঁড়ায় প্রায় ১৪ হাজার টাকার মতো। আর ৬০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে মূল বেতন হবে আনুমানিক ১২ থেকে ১৩ হাজার টাকা। কিন্তু পে-কমিশন সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছে। সেই হিসেবে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি কমিশনের প্রস্তাবনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তিনি আরও বলেন, অতীতের সব পে-স্কেলের দিকে তাকালে দেখা যায়, নিম্ন গ্রেডে কর্মরত কর্মচারীদের মূল বেতন সাধারণত দ্বিগুণ বা তারও বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে। সুতরাং যদি সর্বনিম্ন গ্রেডের বেসিক ১৬ হাজার বা ১৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়, তাহলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১০০ শতাংশ বা তারও বেশি বৃদ্ধি হিসেবে গণ্য হবে। এজন্য তারা প্রত্যাশা করছেন, সরকার অন্তত পে-কমিশনের নির্ধারিত সর্বনিম্ন বেতনের বিষয়টি বহাল রাখবে।
ঐ নেতা আরও উল্লেখ করেন, ২০১৫ সালে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল নির্ধারণ করা হয়েছিল ৮২৫০ টাকা। এরপর ২০২০ সালে নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন হলে তা ১৬ হাজার ৫০০ টাকায় উন্নীত হওয়ার কথা ছিল। আবার ২০২৫ সালেও একটি নতুন পে-স্কেল কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। এই দুটি ধাপ বাস্তবায়ন হলে বর্তমানে সর্বনিম্ন বেতন স্কেল প্রায় ৩৩ হাজার টাকায় পৌঁছাত। সেই বিবেচনায় তারা সর্বনিম্ন বেতন ৩৫ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করেছিলেন।
তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত পে-কমিশন পুলিশ, সেনাবাহিনী, শিক্ষকসহ প্রায় ২০০টি সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে। এসব সংগঠনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে কমিশন সর্বনিম্ন গ্রেডের বেতন ২০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু যদি বাস্তবে মাত্র ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধি করা হয়, তাহলে তা কর্মচারীদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হবে। তাই তারা আশা করছেন, বর্তমান সরকার অন্তর্বর্তী সরকারের পে-কমিশনের সুপারিশই বহাল রাখবে।
অন্যদিকে জানা গেছে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত পে-কমিশন মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে দেশের বর্তমান আর্থিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এই হার কমিয়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে রাখা হতে পারে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গত সোমবার অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে, নবম পে-স্কেল তিন ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দেওয়া হতে পারে। তবে এই বৃদ্ধি সরাসরি কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী হবে না। বরং কমিশনের প্রস্তাবিত বৃদ্ধির হারকে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে সীমিত করে যে পরিমাণ দাঁড়াবে, তার ওপর ভিত্তি করে প্রথম ধাপে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হতে পারে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের জন্য গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির প্রস্তাবের আলোকে কাজ চলছে। খুব শিগগিরই এই প্রস্তাব চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় গঠিত কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বর্তমান সরকারের জন্য কঠিন। তাই মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ বৃদ্ধির একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হতে পারে। তবে বিষয়টি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
এদিকে জানা গেছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির জন্য আগামী অর্থবছরের বাজেটে অন্তত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে প্রস্তাবিত বাজেটের খসড়া প্রস্তুত করেছে।
সূত্রগুলো জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন পাওয়া গেলে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর করা হবে। পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ বাস্তবায়ন করা হতে পারে। আর ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের সুপারিশমালা জমা দেয়। সে সময় জানানো হয়, দেশের প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
নতুন প্রস্তাব বাস্তবায়ন করতে গেলে অতিরিক্ত আরও প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কমিটির প্রতিবেদনও প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তিনটি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে সমন্বিত সুপারিশ তৈরির জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
সূত্রমতে, এই কমিটিই তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের সুপারিশ করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ধাপে ধাপে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা হবে এবং প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দিতে বাজেটে অন্তত ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে।
Leave a Reply