সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের নবম বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির সুপারিশসংবলিত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন জমা দেয়। দীর্ঘ পর্যালোচনা, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের মতামত এবং দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে কমিশন এই সুপারিশমালা প্রণয়ন করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারীদের মূল বেতন বর্তমান কাঠামোর তুলনায় ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন বেতন ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।
কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যমান জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, বাজার পরিস্থিতি এবং সরকারি কর্মচারীদের জীবনমান উন্নয়নের প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় নিয়েই নতুন বেতন কাঠামো প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। কমিশনের সদস্যরা মনে করছেন, নতুন এই কাঠামো বাস্তবায়িত হলে সরকারি চাকরিজীবীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে এবং প্রশাসনিক কাজে গতি ও দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে।
বেসামরিক প্রশাসনের পাশাপাশি পৃথকভাবে জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্যও বেতন কাঠামো সংক্রান্ত পৃথক প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, তিনটি খাতের জন্য প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোতে কিছু ভিন্নতা রাখা হলেও সামগ্রিকভাবে বেতন বৃদ্ধি এবং সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে বিচার বিভাগ ও সশস্ত্র বাহিনীর কর্মকর্তাদের জন্য দায়িত্ব ও পদমর্যাদা অনুযায়ী অতিরিক্ত কিছু সুবিধার সুপারিশও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এদিকে তিনটি পৃথক প্রতিবেদনের সুপারিশ বিশ্লেষণ করে বাস্তবায়নযোগ্য চূড়ান্ত প্রস্তাব তৈরির জন্য গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে বিএনপি সরকার। এই কমিটিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কমিটির মূল দায়িত্ব হচ্ছে প্রস্তাবিত বেতন কাঠামোর আর্থিক প্রভাব বিশ্লেষণ করা এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের উপযোগী সুপারিশ চূড়ান্ত করা।
সরকারি সূত্রগুলো জানিয়েছে, সম্ভাব্য আর্থিক চাপ কমাতে নতুন বেতন কাঠামো একবারে বাস্তবায়ন না করে তিন ধাপে কার্যকর করার চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে নিম্ন আয়ের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি অগ্রাধিকার পেতে পারে। পরবর্তী ধাপে মধ্যম স্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সর্বশেষ ধাপে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নতুন বেতন কাঠামো পুরোপুরি কার্যকর করা হতে পারে বলে জানা গেছে।
প্রস্তাবিত নবম বেতন কাঠামোয় বর্তমানে চালু থাকা ২০টি গ্রেড বহাল রাখার সুপারিশ করা হয়েছে। তবে বেতন স্কেলে বড় ধরনের পরিবর্তন আনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিদ্যমান কাঠামোয় সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত যেখানে ১:৯ দশমিক ৪, সেখানে নতুন প্রস্তাবে এই অনুপাত কমিয়ে ১:৮ নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ নিম্ন ও উচ্চ পর্যায়ের বেতনের ব্যবধান কিছুটা কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা। কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী তা বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে বর্তমানে সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থাকলেও তা দ্বিগুণের বেশি বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে নিম্ন থেকে উচ্চ—সব স্তরের কর্মচারীর বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এ ছাড়া মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সচিব, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখ্যসচিব এবং সিনিয়র সচিবদের জন্য বিদ্যমান ২০ গ্রেডের বাইরে পৃথক বিশেষ ধাপ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে। উচ্চপর্যায়ের এসব কর্মকর্তার বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পরবর্তীতে আলাদা প্রজ্ঞাপন জারি করে নির্ধারণ করা হবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিবেচনায় নিয়েই এই বিশেষ ব্যবস্থা রাখার চিন্তাভাবনা করা হয়েছে।
Leave a Reply