নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে গঠিত পে-কমিশন সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। তবে দেশের বর্তমান আর্থিক বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার সেই সুপারিশ পুরোপুরি কার্যকর করতে পারছে না বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। পরিবর্তে মূল বেতন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর একটি বাস্তবসম্মত প্রস্তাব নিয়ে কাজ চলছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, এই বেতন বৃদ্ধি এককালীন নয়, বরং ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
সোমবার (৪ মে) অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নবম পে-স্কেল তিনটি ধাপে কার্যকর করা হতে পারে। প্রথম ধাপে ২০২৬-২৭ অর্থবছর থেকেই মূল বেতনের প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি দেওয়া হতে পারে। তবে এই ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি সরাসরি পে-কমিশনের মূল সুপারিশের ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হবে না। বরং কমিশনের প্রস্তাবিত ১০০-১৪০ শতাংশ বৃদ্ধির পরিবর্তে সেটিকে কমিয়ে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ করার পর যে পরিমাণ অর্থ দাঁড়াবে, তার অর্ধেক প্রথম ধাপে প্রদান করা হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পে-কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গঠিত উচ্চপর্যায়ের কমিটির সুপারিশ অনুযায়ীই বর্তমানে কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, বিষয়টি খুব শিগগিরই চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গঠিত পে-কমিশনের সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে বেশ কঠিন। তাই একটি সমন্বিত প্রস্তাব হিসেবে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত মূল বেতন বৃদ্ধির বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। তবে এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
এদিকে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির লক্ষ্যে আগামী অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে অতিরিক্ত ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ইতোমধ্যে তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয় একটি খসড়া বাজেট প্রস্তুত করেছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মিললে প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি কার্যকর হবে, এরপর পরবর্তী অর্থবছরে বাকি অংশ প্রদান করা হবে। আর তৃতীয় ধাপে, অর্থাৎ ২০২৮-২৯ অর্থবছরে বিভিন্ন ভাতা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
উল্লেখ্য, সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বে গঠিত ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই প্রতিবেদনে সরকারি কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিস্তারিত সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল। তখন জানানো হয়, বর্তমানে প্রায় ১৪ লাখ সরকারি কর্মচারী এবং ৯ লাখ পেনশনভোগীর জন্য সরকারের মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে, নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী এই ব্যয় আরও উল্লেখযোগ্য হারে বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, পুরো প্রস্তাব বাস্তবায়নে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া জুডিশিয়াল সার্ভিস পে-কমিশন এবং সশস্ত্র বাহিনীর জন্য পৃথক বেতন কাঠামোর প্রতিবেদনও ইতোমধ্যে প্রস্তুত করা হয়েছে। এই তিনটি পৃথক প্রতিবেদনের সুপারিশসমূহ পর্যালোচনা করে একটি সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য গত মাসে মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
এই কমিটিই মূলত তিন ধাপে পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, সরকারের ওপর আর্থিক চাপ কমাতে এবং ধীরে ধীরে ব্যয় সামাল দিতে এই ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছরে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি দিতে বাজেটে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হতে পারে, যা পরবর্তী ধাপগুলোতে আরও বৃদ্ধি পাবে।
Leave a Reply