বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৫০ শতাংশ থেকে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি ডিও লেটার প্রেরণ করেছিলেন। তবে মন্ত্রীর এ প্রস্তাবটি সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি এবং শেষ পর্যন্ত তা অনুমোদন পায়নি।
রবিবার (৫ এপ্রিল) অর্থ মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল দুটি সূত্র জানায়, বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের প্রেক্ষাপটে সরকার অতিরিক্ত ব্যয় বৃদ্ধি থেকে বিরত থাকার নীতি গ্রহণ করেছে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় সব খাতে কৃচ্ছ্রসাধন নীতি অনুসরণ করা হচ্ছে। এ কারণে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাবটি আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। তবে ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে বিষয়টি পুনরায় আলোচনার জন্য তোলা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী পর্যায়েই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সরকার বর্তমানে যে আর্থিক নীতিমালার আওতায় পরিচালিত হচ্ছে, সেই নীতির আলোকে অর্থমন্ত্রী প্রস্তাবটি অনুমোদন করেননি। তিনি আরও বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি পুনর্বিবেচনার জন্য আবারও চিঠি পাঠায়, তাহলে ভবিষ্যতে এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা হওয়ার সুযোগ থাকতে পারে।
অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (বেসরকারি মাধ্যমিক) মো. মিজানুর রহমান এ বিষয়ে বলেন, অর্থ মন্ত্রণালয় কেন প্রস্তাবটি অনুমোদন দেয়নি, সে বিষয়ে তার কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই। তিনি এটিকে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এ বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা শিক্ষামন্ত্রীই দিতে পারবেন।
এর আগে গত ৫ মার্চ শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো ডিও লেটারে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রস্তাব করা হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়, শিক্ষা খাতের উন্নয়নে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নে তাদের ভূমিকা অপরিসীম। তাই তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং চাকরির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
ডিও লেটারে আরও উল্লেখ করা হয়, বিগত সময়ে শিক্ষা খাতের তুলনায় অন্যান্য ভৌত অবকাঠামো খাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের ফলে শিক্ষা বাজেটে সংকোচন দেখা দিয়েছে। এর ফলে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান এবং সামাজিক অবস্থানে বৈষম্য সৃষ্টি হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সরকার শিক্ষা খাতে বাজেট বৃদ্ধি এবং শিক্ষকদের আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।
চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৬৫১ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন, যারা বর্তমানে মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নের স্বার্থে এবং শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে এই ভাতা ৫০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৬০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় মত দেয়।
এতে আরও হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, প্রস্তাবিত ১০ শতাংশ অতিরিক্ত উৎসব ভাতা বাস্তবায়নের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগে বছরে অতিরিক্ত ১৯০ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগে ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা প্রয়োজন হবে। অর্থাৎ মোট অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে ২৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
ডিও লেটারে উল্লেখ করা হয়, এই অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হলে শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনমান উন্নত হবে, তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালনে উৎসাহ বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সামগ্রিক মানোন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সবশেষে চিঠিতে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য অতিরিক্ত ১৯০ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৫০ শতাংশ থেকে বৃদ্ধি করে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।
Leave a Reply