বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বাড়িয়ে মূল বেতনের ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব জানিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে একটি ডিও (ডেমি-অফিসিয়াল) লেটার পাঠানো হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এই চিঠির পর বিষয়টি নিয়ে সরকারি পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে এবং আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে প্রস্তাবটি আলোচনায় আসার পর শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠেছে—বর্ধিত এই উৎসব ভাতা তারা ঠিক কবে থেকে পাবেন। কারণ ইতোমধ্যেই আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে উৎসব ভাতার বিল জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, চলতি ঈদুল ফিতরে শিক্ষক-কর্মচারীরা বাড়তি ১০ শতাংশ উৎসব ভাতা পাওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। কারণ ইতোমধ্যে যেসব বিল জমা দেওয়া হয়েছে, সেগুলোতে আগের নিয়ম অনুযায়ী মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হিসেবেই উৎসব ভাতা ধরা হয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাবটি অনুমোদন পেয়ে অর্থ ছাড়ের অনুমতি মিললে পরবর্তীতে এ বিষয়ে একটি সরকারি পরিপত্র জারি করা হবে। সেই পরিপত্র জারির পর শিক্ষক-কর্মচারীরা ঈদের পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ অর্থ সমন্বয় করে তুলতে পারবেন।
মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, গত বুধবার ছিল এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতার বিল জমা দেওয়ার শেষ দিন। সে অনুযায়ী সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতার বিল জমা দিয়েছে। ফলে আসন্ন ঈদুল ফিতরে বাড়তি ১০ শতাংশ ভাতা পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর মার্চ মাসের বেতনের সঙ্গে ওই অতিরিক্ত অর্থ সমন্বয় করা হতে পারে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে আগামী ঈদুল আজহা থেকেই শিক্ষক-কর্মচারীরা মূল বেতনের ৬০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পেতে পারেন।
এর আগে বৃহস্পতিবার বিকেলে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে উৎসব ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবসংবলিত একটি ডিও লেটার অর্থমন্ত্রীর কাছে পাঠানো হয়। ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতের উন্নয়ন ও অগ্রগতিতে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত শিক্ষক-কর্মচারীদের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এগিয়ে নিতে তাদের নিরলস পরিশ্রম ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রয়েছে। তাই তাদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি, কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা সেবার সার্বিক মান উন্নয়ন করা সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে।
চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, বিগত সময়ে শিক্ষা খাতের উন্নয়নের পরিবর্তে বিভিন্ন ভৌত অবকাঠামো খাতে তুলনামূলকভাবে বেশি অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, যার ফলে শিক্ষা খাতে বাজেট কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান ও সামাজিক অবস্থানে বৈষম্যের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। এসব সংকট থেকে উত্তরণের জন্য বর্তমান সরকার শিক্ষা খাতে বাজেটের আনুপাতিক বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
ডিও লেটারে বলা হয়েছে, শিক্ষা খাতে ব্যয় বাড়ানো হলে একদিকে যেমন শিক্ষার মান উন্নত হবে, অন্যদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হবে এবং তারা আরও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। একইসঙ্গে বিদ্যমান বিভিন্ন বৈষম্যও ধীরে ধীরে কমে আসবে বলে সরকার মনে করে। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করছে।
চিঠিতে আরও বলা হয়, বর্তমানে সারা দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ ৪ হাজার ৬৫১ জন। বর্তমানে তারা সবাই মূল বেতনের ৫০ শতাংশ হারে উৎসব ভাতা পাচ্ছেন। কিন্তু শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধির জন্য শিক্ষকদের জীবনমান উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে সরকার মনে করে। সে কারণেই সরকারের আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনায় চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছর থেকেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
ডিও লেটারে হিসাব দিয়ে বলা হয়েছে, উৎসব ভাতা ১০ শতাংশ বাড়ানো হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের আওতায় বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১৯০ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। একইভাবে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের জন্য অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে প্রায় ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই বিভাগ মিলিয়ে বছরে মোট অতিরিক্ত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়াবে প্রায় ২৮৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, এই অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হলে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দাবি পূরণ হবে এবং তাদের সার্বিক কল্যাণ নিশ্চিত হবে। পাশাপাশি এতে তাদের জীবনমান উন্নয়ন ঘটবে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার সার্বিক মানোন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
সবশেষে ডিও লেটারে অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের উৎসব ভাতা মূল বেতনের ৫০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৬০ শতাংশে উন্নীত করার জন্য ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অনুকূলে অতিরিক্ত ১৯০ কোটি টাকা এবং কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগের অনুকূলে অতিরিক্ত ৯৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়ার জন্য বিশেষভাবে বিবেচনা করার অনুরোধ জানানো হচ্ছে।
Leave a Reply