বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল এক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের একাধিক শীর্ষ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগের ঢল নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন–এ (দুদক)। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। তার বিরুদ্ধে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচারের গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সঙ্গে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস–সহ মন্ত্রিসভার প্রায় সব সদস্যের বিরুদ্ধেই নানা অনিয়ম, আত্মসাৎ ও অর্থ পাচারের লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
এই ব্লগে অভিযোগগুলোর সারাংশ নয়, বরং তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হবে—যাতে বোঝা যায়, এটি কেবল ব্যক্তিবিশেষের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়; বরং রাষ্ট্রীয় জবাবদিহিতার কাঠামোর একটি বড় পরীক্ষা।
দুদকে জমা পড়া একাধিক লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে যে, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ক্ষমতায় থাকার সময় দেশীয় প্রকল্প ও আর্থিক লেনদেনকে ব্যবহার করে বিপুল অর্থ বিদেশে স্থানান্তর করেছেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই অর্থ পাচারের ভৌগোলিক বিস্তৃতি তিনটি দেশে—
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিভিন্ন আর্থিক কৌশল—হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং, শেল কোম্পানি—ব্যবহার করে কয়েক হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে স্থানান্তর করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ–এর কথিত অবৈধ সম্পদের অংশ ব্যবস্থাপনার বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগ এখনো তদন্তাধীন; কোনো আদালত বা কর্তৃপক্ষ এখনো অপরাধ প্রমাণ করেনি—এটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা জরুরি।
অভিযোগে বলা হয়েছে, পরিবারের সদস্যদের নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খুলে সেখানে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে। দুবাই দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক মানি লন্ডারিং তদন্তে একটি আলোচিত আর্থিক কেন্দ্র—এই প্রেক্ষাপটে অভিযোগটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে।
২০২৪ সালে বাকুতে অনুষ্ঠিত COP29–এ অংশগ্রহণের সময় ব্যাংকিং সুবিধা গ্রহণ ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, কূটনৈতিক সফরের সুযোগ ব্যবহার করে আর্থিক লেনদেন সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে এখানে আবারও মনে রাখতে হবে—এসব অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই চলছে; প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য।
রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ হলো পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রকল্প থেকে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ। অভিযোগে বলা হয়েছে—
এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়; বরং পরিবেশ সুরক্ষার মতো একটি নৈতিকভাবে সংবেদনশীল খাতকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
অভিযোগের তালিকায় শুধু একজন নন—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় সব গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার নাম এসেছে।
দুদক জানিয়েছে, সব অভিযোগ নিয়মমাফিক যাচাই করা হবে এবং প্রাথমিক সত্যতা পেলে অনুসন্ধান শুরু হবে।
Transparency International Bangladesh–এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। তবে তদন্ত যেন নিরপেক্ষ হয় এবং কেউ যেন হয়রানির শিকার না হন।”
এই বক্তব্যের মধ্যে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা রয়েছে—
১. আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা
২. রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগ থেকে সুরক্ষা
এই ঘটনাপ্রবাহ একটি বড় প্রশ্ন উত্থাপন করছে—বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি কাঠামো কতটা শক্তিশালী?
যদি অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হয়, তবে তা নির্দেশ করবে—
আর যদি অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হয়, তবে সেটিও একটি সংকেত—রাষ্ট্রীয় অভিযোগ প্রক্রিয়ায় যাচাই-বাছাইয়ের মান উন্নত করা প্রয়োজন।
অভিযোগের ঢল জনমনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। যারা সংস্কার, স্বচ্ছতা ও সুশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তাদের বিরুদ্ধেই যদি এমন অভিযোগ ওঠে—তাহলে তা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য বড় ধাক্কা।
তবে গণতন্ত্রের শক্তি এখানেই—অভিযোগ উঠলে তা তদন্তের মাধ্যমে সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করা যায়। স্বচ্ছ তদন্তই পারে জনআস্থা পুনর্গঠন করতে।
বর্তমান পরিস্থিতি আবেগ নয়, প্রমাণের ভিত্তিতে মোকাবিলা করা প্রয়োজন। দুদকের দায়িত্ব—নিরপেক্ষ তদন্ত করা, প্রাথমিক সত্যতা যাচাই করা এবং প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা নেওয়া।
বাংলাদেশের সামনে এখন তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ—
অভিযোগ যত বড়ই হোক, প্রমাণ ছাড়া কাউকে অপরাধী বলা যায় না। আবার অভিযোগ উপেক্ষা করাও চলে না। আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি—এই দুইয়ের সমন্বয়েই কেবল রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি টিকে থাকতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র, দুবাই ও আজারবাইজান: সাবেক পরিবেশ উপদেষ্টা রিজওয়ানার ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের চাঞ্চল্যকর তথ্য!
পরিবেশ রক্ষার স্লোগান, আইনি লড়াইয়ের খ্যাতি এবং সুশীল সমাজের আইকন—এই সবকিছুই কি তবে ছিল ক্ষমতা দখলের সিঁড়ি এবং মহাদুর্নীতির একটি নিখুঁত ‘ক্যামোফ্লেজ’ বা ছদ্মবেশ? সদ্য বিদায়ি ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়া অভিযোগগুলো বিশ্লেষণ করলে এমন ভয়ংকর সমীকরণই সামনে আসে। শুধু রিজওয়ানা হাসানই নন, বিদায়ি সরকারের দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরো মন্ত্রিসভার বিরুদ্ধে দুদকে রেকর্ডসংখ্যক দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছে।
দীর্ঘ অনুসন্ধান এবং দুদকের দায়িত্বশীল সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যগুলো কেবল সাধারণ দুর্নীতির গল্প নয়; বরং এটি রাষ্ট্রযন্ত্র, কূটনৈতিক প্রটোকল এবং পুরনো রাজনৈতিক সিন্ডিকেটকে ব্যবহার করে প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা পাচারের এক সুপরিকল্পিত ‘ক্রস-বর্ডার মানি লন্ডারিং’ বা আন্তঃদেশীয় অর্থ পাচারের ব্লু-প্রিন্ট।
এই অনুসন্ধানের সবচেয়ে চমকপ্রদ এবং গা শিউরে ওঠা দিকটি হলো—বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সুবিধাভোগীদের সঙ্গে নতুন সংস্কারকদের গোপন অর্থনৈতিক আঁতাত। ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর যখন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী-এমপিদের দুর্নীতির বিচার চাওয়া হচ্ছিল, তখন নেপথ্যে চলছিল অন্য খেলা। দুদকে জমা পড়া অভিযোগ থেকে জানা যায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী অত্যন্ত গোপনে সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের ‘কাস্টোডিয়ান’ বা পাহারাদার হিসেবে কাজ শুরু করেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও দুর্নীতিবাজ অভিজাত শ্রেণির (Elites) মধ্যে অর্থের বিনিময়ে একটি অদৃশ্য সমঝোতা থাকে। অভিযোগ রয়েছে, এই চুক্তির অংশ হিসেবেই নসরুল হামিদের ওই সম্পদ বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং নিরাপদ রুট ব্যবহার করে ৪ হাজার কোটি টাকা যুক্তরাষ্ট্রে পাচার করা হয়।
তিন দেশে অর্থ পাচারের ভৌগোলিক বিস্তৃতি
রিজওয়ানা হাসানের অর্থ পাচারের রুট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তিনি অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন দেশের ইকোনমিক জোনকে বেছে নিয়েছেন:
১. যুক্তরাষ্ট্র (মেগা লন্ডারিং): নসরুল হামিদের সম্পদের ৪ হাজার কোটি টাকার পাশাপাশি, রিজওয়ানা হাসান নিজের ক্ষমতা ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রে আরও প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছেন। হুন্ডি, ওভার-ইনভয়েসিং এবং শেল কোম্পানির (ভুয়া কোম্পানি) মাধ্যমে এই বিপুল পরিমাণ ডলার পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিক অনুসন্ধানে প্রতীয়মান।
২. দুবাই (পারিবারিক নেটওয়ার্ক): অর্থ পাচারের অন্যতম নিরাপদ স্বর্গরাজ্য দুবাইকে তিনি ব্যবহার করেছেন তার আপন বোনের মাধ্যমে। বোনের নামে রাতারাতি খোলা বিশাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশ থেকে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে বিনিয়োগ করা হয়েছে। পারিবারিক সদস্যকে ব্যবহার করা মানি লন্ডারিংয়ের একটি ক্লাসিক মেথড, যাতে নিজের নাম সরাসরি সামনে না আসে।
৩. আজারবাইজান (কূটনৈতিক প্রটোকলের অপব্যবহার): দুর্নীতির ইতিহাসে সবচেয়ে অভিনব ঘটনাটি ঘটে ২০২৪ সালের নভেম্বরে। আজারবাইজানের রাজধানী বাকুতে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলনে (COP29) তিনি যান বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলের নেতা হিসেবে। রাষ্ট্রীয় খরচে এবং ভিআইপি প্রটোকল নিয়ে তিনি জলবায়ু রক্ষার কথা বলতে গিয়ে বাস্তবে নিজের আখের গুছিয়েছেন। কূটনৈতিক সুবিধার (Diplomatic immunity) আড়ালে তিনি বাকুতে একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলেন এবং সেখানে থাকা তার আত্মীয়-স্বজনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে ৫০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন।
পরিবেশ রক্ষার নামে ‘শ্যাডো স্টেট’ ও ১০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ
দুদকে জমা পড়া আটটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগের মধ্যে একটি হলো—পরিবেশ অধিদপ্তরের বিভিন্ন প্রকল্প থেকে ১ হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ[2]। ইসিএ (Ecologically Critical Area) ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু তহবিলের বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের বাজেটকে সুকৌশলে ওভার-ইনভয়েসিং (অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো) ও ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে আত্মসাৎ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি, ‘পরিবেশ রক্ষা’র আইনি ভয় দেখিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জমি অবৈধভাবে দখলের যে অভিযোগ উঠেছে, তা প্রমাণ করে ক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি রীতিমতো একটি ‘শ্যাডো স্টেট’ বা ছায়ামুক্তারিতে পরিণত হয়েছিলেন।
সিস্টেমিক লুটপাট: কাঠগড়ায় পুরো মন্ত্রিসভা
দুদকের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান একাই নন, পুরো অন্তর্বর্তী সরকারই যেন দুর্নীতির এক মহোৎসবে মেতেছিল:
ড. মুহাম্মদ ইউনূস: খোদ সাবেক সরকারপ্রধানের বিরুদ্ধে গ্রামীণ টেলিকম ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অর্থ ব্যবস্থাপনা, আয়কর ফাঁকি, ট্রাস্টের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগ উঠেছে[1]।
আসিফ নজরুল: সাবেক আইন উপদেষ্টার বিরুদ্ধে ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন বাণিজ্য (যার মধ্যে গায়ক তাপসের জামিন অন্যতম), বিচারক পদায়নে অনিয়ম এবং সাব-রেজিস্ট্রার বদলি বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়েছে।
আসিফ মাহমুদ: সাবেক যুব ও শ্রম উপদেষ্টার বিরুদ্ধে বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ গ্রহণ এবং ‘বিটকয়েন’ (ক্রিপ্টোকারেন্সি) ব্যবহারের মাধ্যমে বিদেশে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ উঠেছে।
অন্যান্য উপদেষ্টা: সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপসহ বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে আর্থিক অনিয়ম, স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি ও কেনাকাটায় অনিয়ম এবং তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে বড় অঙ্কের দুর্নীতির অভিযোগ পুরো সরকারের নৈতিক স্খলনের চিত্রই তুলে ধরে।
এই নজিরবিহীন দুর্নীতির বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া গেলে এবং তা আমলযোগ্য হলে অবশ্যই স্বাধীন তদন্ত হতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। তবে একইসঙ্গে যেন কেউ হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও সতর্ক থাকতে হবে।”
তার এই বক্তব্যের বিশ্লেষণাত্মক অর্থ হলো, ‘অধিকারকর্মী’ বা ‘সুশীল সমাজ’ থেকে আসা ব্যক্তিরা যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পান, তখন তাদের ওপর নজরদারির কোনো বিকল্প ব্যবস্থা (Checks and balances) ছিল না। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই তারা দুর্নীতি করেছেন।
সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে ওঠা এই ১২ হাজার কোটি টাকার মানি লন্ডারিং ও দুর্নীতির অভিযোগ বাংলাদেশের ইতিহাসে আস্থার সবচেয়ে বড় সংকট তৈরি করেছে। যারা রাষ্ট্র মেরামতের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন, তারাই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে দিয়েছেন। দুদক বর্তমানে এই শত শত অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই-বাছাই করছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই বিশাল অঙ্কের পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনা এবং এই ‘সাদা কলার’ (White-collar) অপরাধীদের আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করাই এখন নতুন বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে শত শত দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ছে দুর্নীতি দমন কমিশনের কার্যালয়ে। দায়িত্ব ছাড়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এই উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধে এসব লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, যে হারে অভিযোগ আসছে তাতে মনে হচ্ছে, অভিযোগের রেকর্ড হবে। অধিকাংশ অভিযোগে অভিযোগকারী নাম প্রকাশ করেননি, তবে কয়েকটি অভিযোগে অভিযোগকারী নাম-পরিচয় উল্লেখ করেই লিখিত চিঠি দিয়েছেন দুদকে।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, দুদক অন্য সব অভিযোগ যেভাবে যাচাই করে, এসব অভিযোগও একইভাবে যাচাই করা হবে। এদিকে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সূত্র জানিয়েছে, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
সাবেক প্রধান উপদেষ্টার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা হয়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামীণ টেলিকমের কর্মচারীদের। গ্রামীণ ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা ড. ইউনূস কীভাবে নিজের নামে একটি ট্রাস্ট করে গ্রামীণ কল্যাণ এবং গ্রামীণ টেলিকমের অর্থ আত্মসাৎ করছেন, তার বিবরণ তুলে ধরেছেন। এই অভিযোগে বলা হয়েছে, আয়কর ফাঁকি এবং অর্থ আত্মসাতের জন্য ড. ইউনূস তাঁর নিজের নামে একটি ট্রাস্ট গঠন করেছেন।
এই ট্রাস্টের একমাত্র কাজ হলো, ড. ইউনূসের পরিবারের দেখাশোনা করা। এভাবে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ আয়কর ফাঁকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়াও প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনকালে ড. ইউনূস বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার করেছেন বলেও একাধিক অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের এক ডজনের বেশি অভিযোগ জমা পড়েছে। এসব অভিযোগের মধ্যে রয়েছে- মামলা বাণিজ্য, জামিন বাণিজ্য, বিচারক পদায়ন এবং অন্যান্য দুর্নীতি।
একটি অভিযোগে দাবি করা হয়েছে যে, আসিফ নজরুল জামিন বাণিজ্য করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই অভিযোগে একটি শিল্প গ্রুপের সিইও, জালিয়াতির মাধ্যমে ভাই এবং বোনের সম্পত্তি আত্মসাৎ করেন। ছোট বোন তার বিরুদ্ধে মামলা করে, পিবিআই মামলা তদন্ত করে জালিয়াতির প্রমাণ পায়। আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কিন্তু আসিফ নজরুল ২০ কোটি টাকা নিয়ে ভিআইপি আসামিকে জামিন দেওয়ার নির্দেশ দেন। গান বাংলা টেলিভিশনের তাপসের জামিন আসিফ নজরুল বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে করিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত তথ্যও অভিযোগের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এভাবে আসিফ নজরুল ১৮ মাসে টাকার বিনিময়ে বহু জামিন করিয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এ ছাড়াও আসিফ নজরুলের বিরুদ্ধে পদায়নে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ঢাকা এবং আশপাশের এলাকায় বিচারক বদলিতে আসিফ নজরুল ৫০ লাখ থেকে দুই কোটি টাকা পর্যন্ত নিতেন বলে দুর্নীতি দমন কমিশনের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে। সাব রেজিস্ট্রার পদায়নে তার বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। আসিফ নজরুল উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই উত্তরা, বাড্ডা, গুলশান, সাভারের মতো লাভজনক এলাকার সাব রেজিস্ট্রার বদলি করেন। এসব বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের বিরুদ্ধে অন্তত আটটি অভিযোগ এখন পর্যন্ত জমা হয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের একাধিক প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাৎ অন্যতম। এ ছাড়াও রিজওয়ানার বিরুদ্ধে অন্যের সম্পত্তি জোর করে দখল করার অভিযোগও করা হয়েছে। একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে তার স্বামীর বিরুদ্ধে। রিজওয়ানার স্বামী আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের সম্পত্তি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছেন কি না তা তদন্ত করার জন্য দুদককে অনুরোধ জানিয়েছেন একজন।
সাবেক জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খানের বিরুদ্ধে সামিট গ্রুপের কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ জমা পড়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনে। এ ছাড়াও বিভিন্ন বেসরকারি বিদ্যুৎ কোম্পানির সঙ্গে অবৈধ লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতি, হাসপাতালের কেনাকাটায় অনিয়ম এবং দুর্নীতির অভিযোগ করা হয়েছে।
তবে সবচেয়ে বেশি অভিযোগ এসেছে সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে। দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ অভিযোগই ভুক্তভোগীরা নাম-ঠিকানাসহ করেছেন। ঘুষ নিয়ে কাজ না দেওয়ার অভিযোগের সঙ্গে তথ্য-প্রমাণও দেওয়া হয়েছে। আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থ পাচার এবং বেআইনি বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের বিরুদ্ধে টিভি চ্যানেলের লাইসেন্স প্রদানে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ করেছেন একজন। এভাবে প্রায় সব উপদেষ্টার বিরুদ্ধেই অভিযোগ জমা পড়েছে। দুদকের সূত্রগুলো বলেছে, এসব অভিযোগ তারা যাচাইবাছাই করছে। যেসব অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যাবে সেগুলো অনুসন্ধানের আওতায় আনা হবে।
জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, যদি তাদের বিরুদ্ধে প্রাথমিক দুর্নীতির তথ্য পাওয়া যায় এবং সেগুলো আমলযোগ্য হলে তা তদন্ত করা উচিত। কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নন। অভিযোগের সত্যতা পেলে দৃষ্টান্তমূলক জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। আগেও কোনো কোনো উপদেষ্টার দপ্তরের দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। সে সময় কিন্তু দুদকের তেমন কোনো কার্যক্রম চোখে পড়েনি। এখন যেহেতু তারা সরকারে নেই তাহলে দুদক তদন্ত করে দেখতে পারে। আগেও আমরা দেখেছি যারা সরকারে থাকে তাদের বিরুদ্ধে দুদক কোনো পদক্ষেপ নেয় না। এখনো তেমন ধারাবাহিকতা রয়েছে। তবে যদি কারও অভিযোগ আমলযোগ্য হয় সেটারও যুক্তি দুদকের কাছে উপস্থাপন করতে হবে এবং আমলযোগ্য না হওয়ারও যুক্তি উপস্থাপন করতে হবে। একই সঙ্গে কেউ যেন কারও দ্বারা হয়রানির শিকার না হন সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।
Leave a Reply