শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কর্মচারীদের সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি ও পদায়ন সংক্রান্ত ফাইলে তিনি কোনো স্বাক্ষর করেননি। শিক্ষামন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর এখন পর্যন্ত তিনি মাত্র তিনটি ফাইল অনুমোদন করেছেন—দুইজন কর্মকর্তার বিদেশ যাত্রার অনুমতি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এর উপাচার্যের পদত্যাগ সংক্রান্ত ফাইল। বুধবার সন্ধ্যায় এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আলোচিত পদোন্নতির পুরো প্রক্রিয়া আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে জারি করা প্রজ্ঞাপন প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে। তাই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট ফাইল তলব করেছেন এবং পদোন্নতির সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার নির্দেশ দিয়েছেন। শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীও এ সংক্রান্ত কোনো ফাইল অনুমোদন করেননি বলেও জানা গেছে। দুপুরে মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিয়মনীতি অনুসরণ নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি)-এর ৮২ জন কর্মচারীকে জাতীয় বেতন স্কেলের ১০ম গ্রেডে ‘সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা’ পদে পদোন্নতি দিয়ে দেশের বিভিন্ন উপজেলায় পদায়ন করা হয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) সচিবালয়ের ২০২৪ সালের সুপারিশ এবং ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর (কর্মচারী) নিয়োগ বিধিমালা-২০২১’ অনুযায়ী এই পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে। পদোন্নতিপ্রাপ্তরা জাতীয় বেতন স্কেল-২০১৫ অনুযায়ী ১০ম গ্রেডে (১৬,০০০ থেকে ৩৮,৬৪০ টাকা) বেতন-ভাতা পাওয়ার কথা ছিল।
পদোন্নতিপ্রাপ্তদের মধ্যে ছিলেন মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর-এর প্রধান কার্যালয় ও আঞ্চলিক অফিসের সাঁটলিপিকার কাম কম্পিউটার অপারেটর, সাঁটমুদ্রাক্ষরিক, বিভিন্ন সরকারি কলেজ ও বিদ্যালয়ের হিসাবরক্ষক, প্রধান সহকারী এবং উচ্চমান সহকারীরা। অভিযোগ উঠেছে, ১৬তম গ্রেডভুক্ত কিছু কর্মচারীকে একলাফে ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে, যা প্রশাসনিক কাঠামো ও জ্যেষ্ঠতার ধারাবাহিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ে প্রধান শিক্ষক ও অধ্যক্ষদের তদারকির দায়িত্বে থাকা সহকারী উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এ ধরনের পদোন্নতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।
এদিকে অনুসন্ধানে জানা গেছে, মন্ত্রণালয়ের ভেতরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী চক্র এবং মাঠপর্যায়ের কিছু কর্মচারীর সমন্বয়ে গঠিত একটি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দাবি করা হচ্ছে, সদ্য বিদায় নেওয়া মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব শেষ কর্মদিবসে ফাইলটি অনুমোদন করেন এবং পরে তা দ্রুত প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয় যে নতুন শিক্ষামন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনেই পদোন্নতি কার্যকর হয়েছে।
প্রশাসনিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকারি পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত বিভাগীয় পদোন্নতি কমিটির (ডিপিসি) সুপারিশ, শূন্যপদের প্রাপ্যতা, জ্যেষ্ঠতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা—সবকিছু বিবেচনায় নেওয়া হয়। বিশেষ করে উপজেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক পদে দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা এবং বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য থাকা জরুরি। তাই পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখে স্বচ্ছ তদন্তের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রশাসনে শৃঙ্খলা ও আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বর্তমানে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, তদন্ত শেষে বিধি-বিধানের আলোকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মেধাভিত্তিক পদোন্নতি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী।
Leave a Reply