ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে যে নয়টি প্রধান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করা। এটি শুধু একটি আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি নয়, বরং দেশের প্রান্তিক ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর জন্য একটি সামাজিক চুক্তি হিসেবে চিহ্নিত। সরকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, এটি নারীর ক্ষমতায়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি নৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্যোগ।
ফ্যামিলি কার্ড মূলত দেশের প্রান্তিক পরিবারকে প্রতি মাসে সর্বোচ্চ ২,৫০০ টাকা বা সমমূল্যের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে। এই সুবিধা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি করার লক্ষ্যও ইশতেহারে উল্লেখ ছিল। অর্থাৎ, এটি একটি ক্ষণস্থায়ী দান নয়, বরং মানুষের সক্ষমতায় বিনিয়োগের প্রমাণ।
বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই দেশের আটটি বিভাগের আটটি উপজেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। এই কার্যক্রম পরিচালনার জন্য অর্থমন্ত্রীকে সভাপতি করে ১৫ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটির লক্ষ্য, আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রাথমিক প্রতিবেদন তৈরি করা এবং ঈদুল ফিতরের আগে কার্ড বিতরণ নিশ্চিত করা।
ফ্যামিলি কার্ড পরিবারভিত্তিক হলেও এটি দেওয়া হবে পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক নারী সদস্যের নামে। সরকারের ধারণা, নারীরাই পরিবারের ব্যয়ের সবচেয়ে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপক। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন ও পরিবারের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন একসঙ্গে সম্ভব হবে।
ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে প্রতিটি পরিবার মাসে ২,০০০ থেকে ২,৫০০ টাকার সমমূল্যের খাদ্য সহায়তা (যেমন: চাল, আটা, ডাল, তেল) অথবা নগদ অর্থ পাবে। এই সহায়তা ধাপে ধাপে দেশের সব পরিবারকে পৌঁছে দেওয়া হবে, ফলে গড়ে উঠবে একটি সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা বলয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে মূল দায়িত্ব দিয়ে একটি নীতিমালা তৈরির কাজ শুরু করেছে। এতে সহায়তা করবে অর্থ, স্থানীয় সরকার এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই নীতিমালা প্রণয়নের কার্যক্রম শুরু হবে।
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ফ্যামিলি কার্ড একটি সর্বজনীন কর্মসূচি। এর আওতায় ধাপে ধাপে হতদরিদ্র থেকে মধ্যবিত্ত—সবাইকে সুবিধা দেওয়া হবে। সরকারের বিশ্বাস, এই কর্মসূচি দারিদ্র্য হ্রাসের পাশাপাশি দেশের নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।
ফ্যামিলি কার্ড কেবল একটি আর্থিক সহায়তার মাধ্যম নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক চুক্তি, যেখানে নারীর ক্ষমতায়ন, দারিদ্র্য বিমোচন ও পরিবারের উন্নয়ন একত্রে অর্জিত হবে। বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় এটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, যা প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
এই নতুন উদ্যোগ দেশের সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে, যেখানে দারিদ্র্য বিমোচন, নারীর ক্ষমতায়ন এবং সমতা মূল কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে কাজ করবে।
Leave a Reply