বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি। সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নেওয়া এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ১৫ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। আসন্ন Eid al-Fitr-এর আগেই কার্ড বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, যা কর্মসূচিটির জরুরি ও অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কমিটি ও অর্থনৈতিক শাখার অতিরিক্ত সচিব মো. হুমায়ুন কবির স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, কমিটির সভাপতি করা হয়েছে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী-কে। তার নেতৃত্বে কমিটিতে স্থান পেয়েছেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী, মহিলা ও শিশু বিষয়ক ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন, রেহান আসিফ আসাদ, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ নির্বাচন কমিশন সচিবালয়, অর্থ বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও স্থানীয় সরকার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা।
এই বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব থেকে বোঝা যায়, কর্মসূচিটি কেবল ভর্তুকিভিত্তিক সহায়তা নয়—বরং প্রশাসনিক, প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সমন্বয়ের একটি সমন্বিত উদ্যোগ।
বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী কমিটিকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে—
প্রথমত, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বাস্তবায়নের একটি উপযুক্ত ডিজাইন প্রণয়ন এবং সুবিধাভোগী নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণ। অর্থাৎ কারা এই কার্ড পাবেন, কোন মানদণ্ডে পাবেন এবং কীভাবে যাচাই-বাছাই হবে—তা নির্ধারণ করা হবে সুস্পষ্ট নীতিমালার ভিত্তিতে।
দ্বিতীয়ত, প্রাথমিক পর্যায়ে দেশের ৮টি বিভাগের প্রতিটিতে ১টি করে উপজেলা বেছে নিয়ে পাইলট প্রকল্প হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে। এই পাইলট বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে সারাদেশে সম্প্রসারণের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হবে।
তৃতীয়ত, নারীদের জন্য বিদ্যমান অন্য কোনো সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা যায় কি না—তা পর্যালোচনা করা হবে। এতে প্রশাসনিক ব্যয় কমানো এবং দ্রুত বাস্তবায়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
চতুর্থত, সুবিধাভোগীদের একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরির লক্ষ্যে জাতীয় পরিচয়পত্র (NID) এবং National Household Database-এর মধ্যে আন্তঃসংযোগ স্থাপন করে একটি ডিজিটাল MIS (Management Information System) প্রণয়নের সুপারিশ করা হবে। এর মাধ্যমে ভুয়া উপকারভোগী বা দ্বৈত সুবিধা গ্রহণের সুযোগ কমবে এবং স্বচ্ছতা বাড়বে।
সবশেষে, আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর মধ্যে একটি প্রাথমিক প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, যাতে ঈদের আগেই কার্ড বিতরণ সম্ভব হয়।
সরকারি ভাষ্যে বিস্তারিত কাঠামো এখনও প্রকাশ না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, এই কার্ডের মাধ্যমে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলো নির্দিষ্ট পরিমাণ ভর্তুকিযুক্ত খাদ্যপণ্য, নগদ সহায়তা অথবা অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা সুবিধা পেতে পারে। রমজান ও ঈদকে সামনে রেখে বাজারদর নিয়ন্ত্রণ ও নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা—এই কর্মসূচির প্রধান লক্ষ্য হতে পারে।
এটি এক ধরনের টার্গেটেড সোশ্যাল সেফটি নেট প্রোগ্রাম হিসেবে কাজ করতে পারে, যেখানে সরাসরি পরিবারভিত্তিক ডাটার ওপর নির্ভর করে সহায়তা দেওয়া হবে।
‘ফ্যামিলি কার্ড’ সফল করতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—
স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তালিকা প্রণয়ন, প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা এবং দ্রুত সরবরাহ ব্যবস্থাপনা। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি জাতীয় পরিচয়পত্র ও হাউসহোল্ড ডাটাবেজের সমন্বয়ে একটি শক্তিশালী ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা যায়, তাহলে এটি ভবিষ্যতে অন্যান্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিরও ভিত্তি হতে পারে।
তবে বাস্তবায়নে সময়সীমা অত্যন্ত সীমিত। ঈদের আগেই কার্ড বিতরণ করতে হলে দ্রুত নীতিমালা, প্রযুক্তি অবকাঠামো এবং মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে।
বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের পথে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এটি কেবল একটি কার্ড নয়—বরং একটি পরিবারভিত্তিক সামাজিক সুরক্ষা কাঠামোর সূচনা হতে পারে। এখন দেখার বিষয়, কমিটির সুপারিশ কতটা কার্যকর ও বাস্তবসম্মত হয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাধারণ মানুষের হাতে এই সুবিধা পৌঁছানো যায় কি না।
Leave a Reply