নির্বাচন কেবল একটি ভোটের প্রক্রিয়া নয়—এটি একটি জাতির রাজনৈতিক পরিপক্বতা, নাগরিক আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার প্রতিচ্ছবি। ঠিক এই জায়গাতেই ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ–সংক্রান্ত নির্বাচন কমিশনের সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপন নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের কঠোর প্রতিক্রিয়া সেই বিতর্ককে আরও উসকে দিয়েছে। তিনি একে শুধু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক অন্ধকারে ফেরার সম্ভাব্য পদক্ষেপ হিসেবেই দেখছেন।
ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যে ‘জুলাই’ শব্দটি প্রতীকী। এটি একদিকে অতীতের রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার স্মারক, অন্যদিকে ভবিষ্যতের জন্য একটি সতর্ক সংকেত। তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন—জনগণের রায় উপেক্ষা করে যদি কারচুপির চেষ্টা করা হয়, তবে তার প্রতিক্রিয়া ভয়াবহ হতে পারে। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি এটাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে, কেউই বারবার অস্থিরতা বা সংঘাত চায় না। প্রশ্ন হলো, ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করলেই কি সেই আশঙ্কা দূর হয়, নাকি বরং সন্দেহ আরও ঘনীভূত হয়?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের একবার আশপাশের দেশগুলোর দিকে তাকানো জরুরি। প্রতিবেশী ভারত বিশ্বের সবচেয়ে বড় গণতন্ত্র হিসেবে পরিচিত। সেখানে ভোটের দিন ভোটাররা সাধারণত মোবাইল ফোন সঙ্গে নিয়ে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন। তবে বুথের ভেতরে ছবি তোলা বা ভিডিও ধারণের ওপর কড়াকড়ি আছে। অর্থাৎ প্রযুক্তিকে পুরোপুরি নিষিদ্ধ না করে, অপব্যবহার ঠেকানোর দিকেই তাদের জোর। এর ফলে ভোটার নিজেকে নিরাপদ ও ক্ষমতাবান নাগরিক হিসেবে অনুভব করেন।
পাকিস্তানের কথাও আলাদা করে বলা প্রয়োজন। নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধ করা হয়েছে, তবে সেটি সাধারণত উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সিদ্ধান্ত। সার্বিকভাবে দেশজুড়ে blanket নিষেধাজ্ঞা সেখানে নিয়ম নয়। আবার শ্রীলঙ্কায় ভোটের দিন ভোটাররা মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারেন, যদিও গোপন ব্যালটের স্বার্থে বুথের ভেতরে ব্যবহার সীমিত। নেপালেও প্রায় একই রকম চর্চা দেখা যায়—নিয়ন্ত্রণ আছে, কিন্তু নিষেধাজ্ঞা নয়।
এই তুলনাগুলো আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতার দিকে নিয়ে যায়। আধুনিক গণতন্ত্রে মোবাইল ফোন শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি নাগরিকের নিরাপত্তা ও পর্যবেক্ষণের হাতিয়ারও। কোথাও অনিয়ম হলে ছবি বা ভিডিও ধারণ করে তাৎক্ষণিকভাবে জানানো—এটি এক ধরনের সামাজিক নজরদারি, যা নির্বাচনকে আরও স্বচ্ছ করতে পারে। সেখানেই বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ মনে হচ্ছে।
ডা. শফিকুর রহমানের অভিযোগ—একটি পক্ষ পরাজয়ের আশঙ্কায় ভোট ছিনতাইয়ের চেষ্টা করছে—এই সন্দেহকে আরও তীব্র করে। ভোটার যদি মোবাইল ফোন ছাড়া ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করেন, তাহলে তিনি একদিকে যেমন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন, অন্যদিকে তার অভিযোগ জানানোর সক্ষমতাও সীমিত হয়ে যায়। এতে নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার সংকট বাড়ে, কমে না।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জনগণ আর ‘অন্ধকার গলিপথে হাঁটতে’ চায় না। প্রতিবেশী দেশগুলোর অভিজ্ঞতা দেখায়—প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে সঠিক নিয়ম ও নজরদারির মাধ্যমে সেটিকে গণতন্ত্রের পক্ষে কাজে লাগানো সম্ভব। নির্বাচন কমিশনের সামনে তাই কেবল একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের প্রশ্ন নয়; এটি একটি আস্থার প্রশ্ন, একটি ভবিষ্যৎ রাজনীতির দিকনির্দেশনার প্রশ্ন।
যদি সত্যিই আমরা আর ‘জুলাই’ চাই না, তবে নিষেধাজ্ঞার রাজনীতি নয়, স্বচ্ছতার রাজনীতিতেই হাঁটতে হবে। কারণ গণতন্ত্র আলোতে হাঁটে—অন্ধকারে নয়।
Leave a Reply