নবম জাতীয় পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে চলমান আলোচনা ও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের লক্ষ্যে পে-কমিশন সম্প্রতি পূর্ণাঙ্গ কমিশন সভা আহ্বান করেছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে জাতীয় শোক ঘোষণার পাশাপাশি আগামীকাল দেশের সব সরকারি দপ্তরে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে—নির্ধারিত তারিখে কমিশনের ফুল কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হবে কি না।
এ বিষয়ে জানতে দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস মঙ্গলবার বিকেলে কমিশনের একাধিক সদস্যের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নিশ্চিত করেন যে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ঘোষিত সরকারি ছুটির কারণে আগামীকালের নির্ধারিত সভা স্থগিত করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুসারে—এই মুহূর্তে নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি, তবে খুব শিগগিরই উপযুক্ত সময় বিবেচনা করে পরবর্তী সভার তারিখ ঠিক করে কমিশনের সব সদস্যকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়ে দেওয়া হবে।
কমিশনের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আগামীকালের ফুল কমিশন সভা আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে। এখনো বিকল্প তারিখ নির্ধারণ করা হয়নি, তবে বিষয়টি অগ্রাধিকার দিয়ে দেখা হচ্ছে এবং শিগগিরই নতুন দিন-তারিখ ঘোষণা করা হবে।’ তার মতে, পে-স্কেল–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এটি নিয়ে তড়িঘড়ি নয়, বরং পরিপূর্ণ আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছাতে কমিশন সচেষ্ট।
এদিকে নবম জাতীয় পে-স্কেলে গ্রেড সংখ্যা পুনর্বিন্যাস নিয়ে কমিশনের ভেতর জোরালো আলোচনা চলছে। সূত্র জানায়, বিষয়টি নিয়ে বর্তমানে তিন ধরনের মতামত বিদ্যমান। কমিশনের একটি বড় অংশ মনে করেন—বিদ্যমান ২০টি গ্রেড অপরিবর্তিত রেখে কেবল যৌক্তিক হারে বেতন-ভাতা বৃদ্ধি এবং সুবিধাসমূহের পুনর্গঠনের সুপারিশ করাই অধিক বাস্তসম্মত হবে। অন্যদিকে, কমিশনের আরেকটি অংশ এ প্রস্তাবের বিরোধিতা করে যুক্তি দিয়েছে—বেতন কাঠামোর বৈষম্য কমাতে গ্রেড সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে ১৬টিতে নামিয়ে আনা প্রয়োজন।
এর বাইরে কমিশনের আরও কিছু সদস্য গ্রেড সংখ্যা আরও সংক্ষিপ্ত করে ১৪টি গ্রেডে নামানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের যুক্তি—গ্রেড বেশি হলে একই স্তরের কর্মচারীদের মধ্যে বেতনব্যবস্থায় দূরত্ব ও বৈষম্য তৈরি হয়, যা প্রশাসনিক প্রেরণা ও পেশাগত ভারসাম্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তুলনামূলক কম গ্রেড রাখলে বেতন কাঠামো আরও সুষম ও সমন্বিত হবে বলে তারা মনে করেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের এক সদস্য জানান, ‘পে-স্কেলের বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে কমিশনে এখনো পূর্ণ ঐক্যমত তৈরি হয়নি। বিশেষত গ্রেড সংখ্যার প্রশ্নটি সবচেয়ে স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর একটি। গ্রেড অপরিবর্তিত থাকবে, নাকি কমানো হবে—এ বিষয়ে কমিশনের সব সদস্যের মধ্যেই সর্বসম্মত অবস্থান গড়ে ওঠা প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, চূড়ান্ত সুপারিশ প্রণয়নের আগে প্রতিটি মতামতকে গুরুত্বসহকারে বিচার-বিশ্লেষণ করা হচ্ছে।
সূত্র আরও জানায়, নবম পে-স্কেল প্রণয়নের ক্ষেত্রে বিভিন্ন দপ্তর, সংস্থা ও কর্মচারী সংগঠন থেকে প্রাপ্ত প্রস্তাব ও মতামতগুলো চুলচেরা বিশ্লেষণ করছে জাতীয় বেতন কমিশন। এখনো চূড়ান্ত প্রতিবেদন লেখার কাজ শুরু হয়নি; বরং প্রাপ্ত সব তথ্য সাজিয়ে, তুলনা করে ও নীতিগতভাবে যাচাই করার কাজ চলছে। কমিশনের মতে—কর্মচারীদের মহাসমাবেশ, আন্দোলনের কর্মসূচি কিংবা বিভিন্ন চাপ সত্ত্বেও তারা কোনো ধরনের তাড়াহুড়া ছাড়াই বাস্তবমুখী, টেকসই ও যুগোপযোগী একটি সুপারিশ তৈরির দিকেই মনোযোগী।
এ জন্য প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের মতামত লিখিতভাবে নথিবদ্ধ করা, বিশ্লেষণ করা এবং প্রাসঙ্গিক অর্থনৈতিক প্রভাব যাচাইয়ের কাজ সম্পন্ন করতে আরও কিছু সময় লাগবে বলে কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্য নিয়ে গত জুলাই মাসে অন্তর্বর্তী সরকার নবম জাতীয় পে-কমিশন গঠন করে। প্রজ্ঞাপনে কমিশনকে ছয় মাসের মধ্যে চূড়ান্ত সুপারিশ পেশ করার বাধ্যবাধকতা নির্ধারণ করা হয়। তবে কর্মচারী সংগঠনগুলোর দাবি—ডিসেম্বরের ১৫ তারিখের মধ্যেই নতুন পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করতে হবে, যাতে দ্রুততম সময়ে বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথ সুগম হয়। কমিশন বর্তমানে এই প্রত্যাশা ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার মধ্যে সমন্বয় ঘটিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ প্রস্তাব চূড়ান্ত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
Leave a Reply