বেসরকারি স্কুল ও কলেজে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য অতিরিক্ত পেশায় সম্পৃক্ততার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা জারি করা হয়েছে। নির্দেশনা অনুযায়ী, মসজিদের পূর্ণকালীন ইমামতি, দোকান বা ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনাসহ মোট ১১টি পেশায় যুক্ত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের। গত রবিবার (তারিখ উল্লেখযোগ্য) মাদারীপুরের কালকিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস থেকে এ সংক্রান্ত নোটিশ উপজেলার সব স্কুল ও কলেজে পাঠানো হয়।
কালকিনি উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আশরাফুজ্জামান চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) থেকে একটি দাপ্তরিক চিঠির মাধ্যমে নির্দিষ্ট ১১টি পেশাকে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য নিষিদ্ধ ও সীমাবদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। ওই চিঠির আলোকে উপজেলা পর্যায় থেকে নোটিশ জারি করে সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, কেউ এই নির্দেশনা অমান্য করলে এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, প্রয়োজনে এমপিও স্থগিত বা বাতিলের মতো পদক্ষেপও আসতে পারে।
নোটিশে ব্যাখ্যা দিয়ে বলা হয়, ‘বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (স্কুল ও কলেজ) জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা–২০২৫ অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকগণ একটি পূর্ণকালীন, সম্মানজনক ও রাষ্ট্রীয় আর্থিক সুবিধাপ্রাপ্ত পেশায় নিয়োজিত।’ ফলে একজন শিক্ষক তাঁর কর্মঘণ্টা ও পেশাগত মনোযোগ সম্পূর্ণভাবে শিক্ষা কার্যক্রমে ব্যয় করবেন—এটাই নীতিমালার মূল উদ্দেশ্য। শিক্ষার মান নিশ্চিত করতে এবং শিক্ষকদের পেশাগত দায়িত্বে শৈথিল্য রোধ করতেই শিক্ষকতার পাশাপাশি লাভজনক অন্য পেশায় যুক্ত হওয়া নীতিগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
নির্দেশনায় যেসব পেশা স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ বা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে, তার মধ্যে রয়েছে—বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সাংবাদিকতা, আইন পেশা (কারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও আদালতের কার্যক্রম একই সময়ে পরিচালিত হয়), কোচিং সেন্টার পরিচালনা বা সেখানে শিক্ষকতা, প্রাইভেট বা কেজি স্কুল পরিচালনা, শিক্ষাবিষয়ক প্রকাশনা বা পাবলিকেশন্স ব্যবসায় অংশগ্রহণ, হজ এজেন্ট বা হজ কার্যক্রমের মার্কেটিং, বিয়ের কাজী বা ঘটকালী পেশা, টং দোকান বা অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবসা পরিচালনা, ঠিকাদারি বা নির্মাণ ব্যবসা, মসজিদের পূর্ণকালীন ইমাম বা খতিবের দায়িত্ব পালন—যা শিক্ষকতার সময়সূচিকে সরাসরি প্রভাবিত করে—এবং কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিশেষ সহকারী, প্রতিনিধি বা চাটুকার হিসেবে কাজ করা।
তবে নির্দেশনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যাও যুক্ত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, কোনো শিক্ষক যদি স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে ধর্মীয়, সামাজিক বা মানবিক কাজে যুক্ত থাকেন, তাহলে তা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ নয়। তবে সেই কর্মকাণ্ড অবশ্যই সীমিত পরিসরে হতে হবে এবং কোনোভাবেই যেন শিক্ষকের মূল পেশাগত দায়িত্ব, পাঠদান, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত কার্যক্রম ব্যাহত না হয়—সেদিকে কঠোর নজর রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা প্রশাসনের সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই নির্দেশনার মাধ্যমে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের পেশাগত শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠদানের মান ও শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়বদ্ধতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মাঠপর্যায়ে অনেক শিক্ষক এই সিদ্ধান্তকে বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করছেন, কারণ দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে অনেকেই অতিরিক্ত আয়ের জন্য বিভিন্ন পেশায় যুক্ত ছিলেন। ফলে নতুন নির্দেশনা ঘিরে শিক্ষক মহলে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।

Leave a Reply