নবম পে-স্কেল প্রণয়নকে কেন্দ্র করে অন্তর্বর্তী সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরে কর্মরত সচিবদের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক করেছে জাতীয় পে-কমিশন। এসব বৈঠকে সচিবরা স্পষ্টভাবে মতামত দিয়েছেন যে, নবম পে-স্কেল নিয়ে কোনো ধরনের আকাশচুম্বী সুপারিশ করা উচিত নয়; বরং সরকারের সামগ্রিক আর্থিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাস্তবসম্মত ও প্রয়োগযোগ্য প্রস্তাব তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। যদিও বিভিন্ন সংগঠন কমিশনের কাছে বর্তমান বেতন স্কেলের তিন থেকে চার গুন পর্যন্ত বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে, সচিবরা এসব অতিরঞ্জিত প্রস্তাবের বিরোধিতা করছেন।
পে-কমিশনের একটি বিশ্বস্ত সূত্র জানায়, অনলাইনে মতামত গ্রহণের পর কমিশন প্রায় আড়াই শতাধিক পেশাজীবী ও কর্মচারী সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করেছে। সবশেষে ৭০টিরও অধিক মন্ত্রণালয়ের সচিবদের সঙ্গে চার ধাপে বৈঠক করে তাদের মতামত সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব মতামত কমিশন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে।
জানা যায়, ২৪ নভেম্বর প্রথম পর্বের বৈঠকে ১৭ জনের মতো সচিব উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তী প্রতিটি ধাপেও প্রায় একই সংখ্যক সচিব পে-কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেন। সচিবরা নানা ধরনের মন্তব্য দিলেও অধিকাংশই বলেছেন—নতুন পে-স্কেল অবশ্যই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে, এবং আগামী ৫ থেকে ১০ বছরের সম্ভাব্য বাজার পরিস্থিতিকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে তারা সরকারের আর্থিক সক্ষমতা, বাজেটের সীমাবদ্ধতা এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধির বাস্তবচিত্র মাথায় রেখে প্রস্তাব চূড়ান্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কমিশনের একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিভিন্ন সংগঠন তিন-চার গুন বেতন বৃদ্ধির দাবি জানালেও সচিবরা তা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেন। তাদের মতে, এ ধরনের অতিরিক্ত প্রস্তাব বাস্তবায়ন কাঠামোকে চাপের মুখে ফেলবে, যা সরকারের পক্ষে বহন করা কঠিন হবে।
পে-কমিশনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা আরও জানান, ৭০ জনের বেশি সচিবের মতামত সংগ্রহ করা অনেক কঠিন ছিল। একত্রে তাদের পাওয়া সম্ভব নয় বুঝেই চার ধাপে সভা আয়োজন করা হয়েছে। প্রতিটি ধাপে সচিবরা উপস্থিত হয়ে গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিয়েছেন, যা এখন কমিশনের সদস্যরা পর্যালোচনা করছেন। তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই কমিশন সুপারিশ চূড়ান্ত করে জমা দিতে পারবে।
প্রথম সভা শেষে কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, সচিবদের সঙ্গে আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে, যদিও সবাই উপস্থিত ছিলেন না। পরবর্তী ধাপগুলোতেও সচিবদের সঙ্গে আবার বৈঠক করা হবে। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, সব আলোচনা শেষ করে অল্প সময়ের মধ্যেই চূড়ান্ত সুপারিশ জমা দেওয়া সম্ভব হবে। পরদিনই দ্বিতীয় দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
কমিশনের একাধিক সদস্য জানিয়েছেন, সুপারিশ চূড়ান্ত করার কাজে কমিশনের সব সদস্য এখন পুরোপুরি মনোনিবেশ করেছেন। ইতোমধ্যে অর্ধেকের বেশি কাজ শেষ হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামী মাসেই চূড়ান্ত খসড়া সুপারিশ জমা দেওয়া সম্ভব হবে। বিশেষ করে সর্বনিম্ন বেতন কাঠামো এবং বেতন গ্রেড পুনর্গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হচ্ছে।
এদিকে বাংলাদেশ সচিবালয় কর্মকর্তা-কর্মচারী সংযুক্ত পরিষদের সভাপতি বাদিউল কবির কমিশনের চেয়ারম্যানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। তিনি বলেন, কমিশনের চেয়ারম্যান ব্যক্তিগতভাবে কোনো মতামত দিতে পারেন না; সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। আলোচনার অগ্রগতি ও কমিশনের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে চেয়ারম্যান যে ধারণা দিয়েছেন, তাতে তারা সন্তুষ্ট।
Leave a Reply