বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষসহ নেতৃত্বের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ এখন থেকে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) মাধ্যমে সম্পন্ন হবে। পূর্ববর্তী নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে মেধা ও যোগ্যতাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে এনটিআরসিএর বিদ্যমান নিয়োগ বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। সংশোধিত বিধিমালাটি বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং আগামী সপ্তাহেই এর গেজেট প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগ–সংক্রান্ত বিধিমালা সংশোধনের কার্যক্রম ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। সংশোধিত নথিটি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব রেহানা পারভীনের দপ্তরে রয়েছে। বুধবার সচিবের স্বাক্ষর শেষ হলে এটি দ্রুত বিজি প্রেসে ছাপার জন্য পাঠানো হবে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, “বিধিমালা চূড়ান্ত। কেবল সচিবের আনুষ্ঠানিক অনুমোদনের অপেক্ষায়। স্বাক্ষর হয়ে গেলে আগামী সপ্তাহেই গেজেট প্রকাশ করা সম্ভব।”
গেজেট প্রকাশের পরই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রধান নিয়োগ প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করার পরিকল্পনা করছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। ডিসেম্বরের শুরুতেই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা যায় কি না, তা নিয়ে মন্ত্রণালয় এনটিআরসিএর সঙ্গে শিগগিরই বৈঠক করবে। বহু প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে প্রধানের পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত হচ্ছে। বিষয়টি উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “প্রতিষ্ঠান প্রধান না থাকায় অনেক স্কুল–কলেজে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই ডিসেম্বরের শুরুতে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ আমাদের অগ্রাধিকার তালিকায় আছে। এনটিআরসিএর সঙ্গে আলোচনার পরই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।”
সংশোধিত বিধিমালা অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠান প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ ও উপাধ্যক্ষের নিয়োগ হবে বাছাই পরীক্ষার মাধ্যমে। তবে পরীক্ষার কাঠামো এখনো নির্দিষ্ট নয়। লিখিত পরীক্ষার মোট নম্বর কত হবে, মৌখিক বা ভাইভায় কত নম্বর থাকবে—এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এনটিআরসিএর নির্বাহী বোর্ড। মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তার ভাষায়, “বাছাই পরীক্ষার বিষয়টি গেজেটে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও নম্বর কাঠামো সেখানে রাখা হয়নি। কমিটি ১০০ নম্বর মূল্যায়ন প্রস্তাব করেছিল, তবে সেটি অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। তাই মূল্যায়নের ব্যাপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে এনটিআরসিএ নিজেদের নীতিমালা অনুযায়ী।”
এর আগে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধানসহ সব নেতৃত্বস্থানীয় পদে নিয়োগ দিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি (ম্যানেজিং কমিটি)। কিন্তু এই পদ্ধতিটি দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ছিল। ঘুষ–দুর্নীতি, রাজনৈতিক প্রভাব, আত্মীয়করণ, অযোগ্য ব্যক্তিকে প্রভাব খাটিয়ে নিয়োগ দেওয়ার মতো অভিযোগ ছিল নিয়মিত। স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছার উপর ভিত্তি করে প্রধান নিয়োগ দেওয়ার ঘটনাও প্রায়ই দেখা যেত। এসব অনিয়ম ও স্বচ্ছতা সংকট দূর করার লক্ষ্যেই বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ম্যানেজিং কমিটির নিয়োগ পদ্ধতি বাতিল করে নতুন নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়।
এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষা মন্ত্রণালয় ৬ অক্টোবর এক বিজ্ঞপ্তি জারি করে জানায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রধান, সহকারী প্রধান, অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষসহ সব সমমানের পদে নিয়োগ দেবে এনটিআরসিএ। সরকারের নীতিগত এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্রীভূত, স্বচ্ছ এবং মানসম্পন্ন করার উদ্দেশ্য স্পষ্ট করা হয়। তার আগের দিন বিশ্ব শিক্ষক দিবসে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, একজন প্রতিষ্ঠান প্রধানের ভূমিকা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দিকনির্দেশনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং প্রশাসনিক কাঠামো নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই যোগ্য ও মেধাবী নেতৃত্ব গড়ে তুলেই শিক্ষাখাতে স্থায়ী পরিবর্তন আনা সম্ভব।
গেজেট প্রকাশ, বিজ্ঞপ্তি জারি এবং পরবর্তী পরীক্ষার পরিকল্পনা—সব মিলিয়ে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের নতুন কাঠামো বাস্তবায়নের পথে শিক্ষা মন্ত্রণালয় দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। মন্ত্রণালয়ের ধারণা, নতুন পদ্ধতি কার্যকর হলে নিয়োগ–সংক্রান্ত অনিয়ম কমবে, প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদে শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে।
Leave a Reply