বদলি বা স্থানান্তর— এটি শিক্ষকতার পেশায় একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। শিক্ষার মান উন্নয়ন, কর্মস্থলে দক্ষতার ভারসাম্য বজায় রাখা এবং শিক্ষকদের পারিবারিক, সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় বদলির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বদলি প্রসঙ্গে অদ্ভুত এক বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। এই বিভাজন হচ্ছে মূলত নিয়োগপদ্ধতি ঘিরে— যেখানে একপক্ষে রয়েছেন “কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক” এবং অন্যপক্ষে “এনটিআরসিএ (NTRCA) এর মাধ্যমে সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক”। অথচ বাস্তবতা হলো, দু’পক্ষই শিক্ষক, দু’জনই একই শিক্ষা ব্যবস্থার অংশ, একই এমপিও কাঠামোর আওতায় কাজ করছেন এবং দু’জনেরই লক্ষ্য— জাতিকে আলোকিত করা।
তাহলে প্রশ্ন ওঠে— এই বিভাজনের প্রয়োজন কী? কেন এমন একটি সুন্দর পরিকল্পনা— যেমন স্বচ্ছ বদলি সফটওয়্যার বা সংশোধিত বদলি নীতিমালা— বাস্তবায়নের মুখে গোষ্ঠীগত ভেদাভেদ তুলে ধরে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে? শিক্ষক সমাজের ঐক্যের জায়গায় যখন বিভাজন ঢুকে পড়ে, তখন তা কেবল একজন শিক্ষকের ক্ষতি নয়, বরং গোটা শিক্ষা ব্যবস্থার জন্যই ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনে।
একসময় আমাদের দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের দায়িত্ব ছিল পরিচালনা কমিটির হাতে। পরে সময়ের দাবি ও যোগ্যতার মানদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য গঠিত হয় এনটিআরসিএ— একটি স্বচ্ছ পরীক্ষাভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, সময় ও প্রযুক্তির বিবর্তনে নিয়োগের ধরন বদলেছে, কিন্তু শিক্ষক হওয়ার যোগ্যতা, দায়িত্ব বা মর্যাদা মোটেও বদলায়নি। যে শিক্ষক কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ পেয়েছিলেন, তিনি সেই সময়ের নিয়ম অনুযায়ী চাকরি পেয়েছেন— এতে তার কোনো দোষ বা ঘাটতি নেই। আবার যারা এনটিআরসিএ পাস করে নিয়োগ পেয়েছেন, তারা বর্তমান আইন ও পদ্ধতি অনুসারে নিয়োগপ্রাপ্ত। সুতরাং, নিয়োগের পদ্ধতি ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু শিক্ষক হিসেবে তাঁদের অবস্থান সমান হওয়া উচিত।
আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, আজকের এই এমপিও কাঠামো, আজকের এই সামান্য সুযোগ-সুবিধাগুলো কোনো একদিনে তৈরি হয়নি। যারা আজ থেকে বিশ বা ত্রিশ বছর আগে এই পেশায় এসেছেন, তাঁরা খুব সীমিত বেতন, দেরিতে পাওয়া বেতন, এমনকি অনাহারে-অর্ধাহারে থেকেও এই শিক্ষা ব্যবস্থা টিকিয়ে রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন কমিটি নিয়োগপ্রাপ্ত। তাঁরা যদি সে সময়ে এই পেশা ত্যাগ করতেন, আজ হয়তো বেসরকারি শিক্ষাক্ষেত্র বলে কিছুই থাকত না। তাই তাঁদের অবদানকে ছোট করে দেখা মানে নিজেকেই অবমূল্যায়ন করা।
বর্তমানে সরকার বদলি প্রক্রিয়া আধুনিকায়নের জন্য সফটওয়্যার চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে বদলি হবে স্বচ্ছ, দূরত্ব ও পারিবারিক অবস্থার ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে। কিন্তু এই আধুনিক পদক্ষেপ বাস্তবায়নের আগেই কেউ কেউ নিয়োগপদ্ধতির দোহাই দিয়ে বিরোধিতা শুরু করেছেন। আসলে এই বিভাজন তৈরি করে প্রকৃত সংস্কারের পথেই বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। অথচ এই বদলি সফটওয়্যার বাস্তবায়ন হলে, তা শিক্ষক সমাজের জন্য যেমন স্বস্তির, তেমনি ন্যায্যতারও প্রতীক হতে পারত।
শিক্ষকদের মধ্যে বিভাজন থাকলে সেই সুযোগে নীতিনির্ধারক মহলও নানা অজুহাতে গুরুত্বপূর্ণ দাবি ঝুলিয়ে রাখতে পারেন। যেমন, এখনো পে-স্কেল বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা চলছে, উৎসব ভাতা শতভাগ হয়নি, অবসর ভাতা ও প্রমোশনেও রয়েছে বৈষম্য। এসব সমস্যা সমাধানে শিক্ষক সমাজের ঐক্য ছাড়া কোনো আন্দোলনই সফল হতে পারে না। বাড়িভাড়া আন্দোলন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। কমিটি নিয়োগপ্রাপ্ত থেকে শুরু করে এনটিআরসিএ নিয়োগপ্রাপ্ত— সবাই যখন এক কাতারে দাঁড়িয়েছিলেন, তখনই ১৫ শতাংশ বাড়িভাড়া অনুমোদনের মতো বড় অর্জন সম্ভব হয়েছে।
এখন সময় এসেছে আরও বৃহত্তর লক্ষ্য নিয়ে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার। বদলি নীতিমালা, প্রমোশন, বেতন কাঠামো কিংবা পেনশন— সব ক্ষেত্রেই সমতা প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদের ভাবতে হবে যে আমরা শিক্ষক এই পরিচয় নিয়ে ‘আমাদের কে নিয়োগ দিয়েছে, কিভাবে নিয়োগ দিয়েছে, কিভাবে নিয়োগ পেয়েছি সেই ভাবনা নিয়ে নয়, বরং ‘আমরা কীভাবে শিক্ষার মান বাড়াতে পারি’ তাই ভাবার সময় এখন এসেছে, কিভাবে আমরা এদেশের শিক্ষার মান উন্নয়ন ঘটাতে পারব সেই বিষয় নিয়ে। শিক্ষকতার মূলে নিয়োগপদ্ধতি নয়, দায়িত্ববোধ ও নিবেদনই আসল পরিচয়।
আজ যখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় নতুন বদলি নীতিমালার খসড়া তৈরি করছে, তখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে দূরত্ব, , জ্যেষ্ঠতা ও নারী শিক্ষক এই তিন বিবেচনা। এটি একটি প্রশংসনীয় পদক্ষেপ। তবে এই নীতিমালার প্রয়োগের সময় যেন কারও নিয়োগ পদ্ধতি দেখে বৈষম্য করা না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষক সমাজকেই নজর রাখতে হবে। আমাদের দাবি হওয়া উচিত— বদলি হোক ন্যায্য ও একক নীতিতে, কোনো শিক্ষক যেন বঞ্চিত না হন।
শেষ পর্যন্ত একটি কথাই স্পষ্ট— বিভাজন আমাদের দুর্বল করে, আর ঐক্য আমাদের শক্তিশালী করে। আমরা যদি নিজেরা নিজেদের মধ্যে গোষ্ঠীভেদ তৈরি করি, তাহলে আমাদের ন্যায্য দাবিগুলো সবসময় উপেক্ষিত থাকবে। কিন্তু যদি আমরা একসাথে দাঁড়াই, যেমনটি করেছি বাড়িভাড়া আন্দোলনে, তাহলে অচিরেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়ন, শতভাগ উৎসব ভাতা, এবং বদলি বৈষম্য দূরীকরণের মতো দাবিগুলোও বাস্তব রূপ নেবে।
তাই সময় এসেছে নিজেদের পরিচয় একটিই ধরে রাখার— আমরা এমপিওভুক্ত শিক্ষক, আমরা শিক্ষার সৈনিক। নিয়োগের ধরন যাই হোক, আমাদের লক্ষ্য এক, আমাদের স্বপ্ন এক, আমাদের অধিকারও এক। বিভাজন নয়, ঐক্যই হবে আমাদের শক্তির ভিত্তি। আমরা যদি সবাই এক হয়ে এগিয়ে যাই, তাহলে সফলতা আমাদের দ্বারপ্রান্তে— ইনশাআল্লাহ।
Leave a Reply