সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়ন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জল্পনা চলছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, পে কমিশনের সদস্যরা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ শেষ করার চেষ্টা করছেন। কিন্তু এরইমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ রোববার ঘোষণা দিয়েছেন—“নতুন পে কমিশন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আগামী সরকার।” এই বক্তব্য প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই সরকারি চাকরিজীবী মহলে শুরু হয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও হতাশা। কারণ, এর আগে একই উপদেষ্টা আশ্বাস দিয়েছিলেন, বর্তমান সরকারই আগামী বছরের শুরুতে নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করবে। এখন তার এই বিপরীত বক্তব্যে সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে, অনেকে একে ‘আশাভঙ্গের ঘোষণা’ বলেও অভিহিত করছেন।
পে কমিশনের কাজ শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিজীবীদের ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় নতুন বেতন কাঠামো তৈরি করার উদ্দেশ্যে। দেশের প্রায় ২২ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এখন নতুন স্কেলের অপেক্ষায় রয়েছেন। তারা মনে করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বকালীন সময়েই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল, কারণ কমিশন ইতিমধ্যেই প্রায় সব কাজ শেষ করেছে।
সরকারি কর্মচারীরা বলছেন, “আমরা আর অপেক্ষা করতে পারব না। ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন স্কেল ঘোষণা না হলে আন্দোলনে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।” অনেক সংগঠন ইতিমধ্যেই নিজেদের মধ্যে আলোচনায় বসেছে, পরবর্তী কর্মসূচি নির্ধারণের প্রস্তুতিও নিচ্ছে। তাদের যুক্তি—নতুন সরকার আসতে সময় লাগবে, আর সেটি কার্যকর হতে আরও বিলম্ব হবে। তাতে চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার ব্যয়ভার আরও বেড়ে যাবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম মনে করেন, সরকার আসলে শুরু থেকেই পে স্কেল বাস্তবায়নের দায় পরবর্তী সরকারের ওপর চাপানোর কৌশল নিয়েছিল। তিনি বলেন,
তিনি আরও যোগ করেন,-“বর্তমান সরকারের রাজস্ব আয় যেমন কমেছে, তেমনি ঋণের বোঝা বহুগুণ বেড়েছে। রাজস্ব আয়ের বড় অংশই এখন ঋণের সুদ ও আমদানি ব্যয়ে ব্যয়িত হচ্ছে। ফলে হাতে বাড়তি অর্থ নেই। এই অবস্থায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বাড়ানো অবাস্তব ও অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে।”
“এখন দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো ভঙ্গুর অবস্থায় রয়েছে। মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, এবং বাজেট ঘাটতি একসঙ্গে চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে আসন্ন নির্বাচন ও সম্ভাব্য গণভোটের জন্য বিশাল অঙ্কের অর্থ বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে সরকার পে স্কেল ঘোষণার মতো ব্যয়বহুল সিদ্ধান্ত নেওয়ার অবস্থায় নেই।”
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি কর্মচারীদের সবচেয়ে বড় চাপ এখন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি। গত চার বছর ধরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের কাছাকাছি ঘুরছে, যা বাস্তব হিসেবে কর্মচারীদের আয়কে কমিয়ে দিয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। অন্যদিকে, বাড়িভাড়া, পরিবহন খরচ ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে গেছে দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি আর্থিক সংকটে ভুগছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন,
“অষ্টম পে কমিশনের পর নবম পে কমিশন আসতে ১১ বছর লেগেছে। এর মধ্যে সরকারের পক্ষ থেকে কোনো নতুন বেতন কাঠামো দেওয়া হয়নি। অথচ একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তাই নতুন স্কেলের দাবি সম্পূর্ণ যৌক্তিক। কিন্তু সরকার সেই যৌক্তিক দাবিকে বাস্তবায়ন করার অর্থনৈতিক সক্ষমতা হারিয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,-“অন্তর্বর্তী সরকারের কাছ থেকে অনেকেই আশা করেছিলেন তারা অন্তত অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনবেন। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, তারা আগের মতোই অজুহাতের আশ্রয় নিচ্ছেন। পে কমিশনের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের হাতে তুলে দেওয়াই এর স্পষ্ট প্রমাণ।”
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি প্রায় ৩ লক্ষ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা দেশের ইতিহাসে অন্যতম বড় ঘাটতি। কর আদায় আশানুরূপ না হওয়ায় সরকার বারবার ব্যাংক থেকে ঋণ নিচ্ছে। এই ঋণ পরিশোধের চাপেই অর্থনীতি ক্রমে দুর্বল হচ্ছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস, যা সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণে বাধা সৃষ্টি করছে।
অধ্যাপক সাহাদাত হোসেন বলেন,-“নতুন পে স্কেল ঘোষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থের জোগান দরকার, সেটি এখন সরকারের নাগালের বাইরে। শুধুমাত্র সরকারি বেতন বাড়াতে গেলেই বার্ষিক ব্যয় বাড়বে প্রায় ৬০ থেকে ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ অবস্থায় রাজস্ব ঘাটতি আরও বাড়বে, যা অর্থনীতিকে আরও বিপদে ফেলবে।”
বিশেষজ্ঞদের সার্বিক মতামত-সবমিলিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুই দিক থেকেই সরকার এখন এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। নির্বাচন সামনে রেখে কোনো বিতর্কিত বা ঝুঁকিপূর্ণ আর্থিক সিদ্ধান্ত নিতে চাইছে না তারা। ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার সম্ভাবনা এখন কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক আইনুল ইসলামের ভাষায়,
“সরকার এখন সময়ক্ষেপণ করছে। নির্বাচনের পর যেই সরকার আসবে, তাদের ওপরই বর্তাবে নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের চাপ। কিন্তু তারাও সহজে এই চাপ সামলাতে পারবে না।”
অতএব, দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পরও সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন পুনর্গঠনের স্বপ্ন আবারও অনিশ্চয়তার ঘেরাটোপে আটকে গেল। পে কমিশনের কাজ প্রায় শেষ হলেও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা এবং সরকারের সীমিত আর্থিক সামর্থ্য নতুন পে স্কেল ঘোষণার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন সরকারি কর্মচারীরা তাকিয়ে আছেন ভবিষ্যৎ সরকারের দিকে—তারা হয়তো আশা করছেন, নতুন সরকারই তাদের ন্যায্য প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাবে।
Leave a Reply