সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো চূড়ান্তের প্রক্রিয়া এখন শেষ পর্যায়ে, তবে এর মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ রোববার জানিয়েছেন, নতুন পে কমিশনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে আগামী সরকার। অথচ কমিশনের কার্যক্রম শুরু হওয়ার সময় তিনি বলেছিলেন, আগামী বছরের শুরুতেই এই সরকার নতুন পে স্কেল কার্যকর করবে।
এই বক্তব্যে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সরকারি চাকরিজীবীদের অনেকে। তাদের দাবি, বর্তমান সরকারই নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণা ও বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিক। তারা মনে করছেন, দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর গঠিত নবম পে কমিশনের ফলাফল অনিশ্চিত করে দিলে তা কর্মচারীদের সঙ্গে সরকারের আস্থার সম্পর্ক নষ্ট করবে। ইতিমধ্যে কর্মচারীরা ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো ঘোষণার আল্টিমেটাম দিয়েছেন এবং এখন নিজেদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারের আর্থিক সীমাবদ্ধতাই এই সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ সাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, অষ্টম পে কমিশনের পর নবম কমিশন পেতে ১১ বছর লেগেছে। এই সময়ের মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতি বহুগুণ বেড়েছে। গত চার বছর ধরে দেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে রয়েছে। অথচ সরকার রাজস্ব আয় বাড়াতে না পেরে ঋণ পরিশোধ এবং ব্যয় নির্বাহেই হিমশিম খাচ্ছে। ফলে এখন বড় আকারে বেতন বৃদ্ধি করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলামও একই মত প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারের রাজস্ব আয় ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ঋণের সুদ পরিশোধের চাপ এবং অপ্রয়োজনীয় খরচের কারণে অর্থনৈতিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থায় ৮০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বেতন বৃদ্ধি করা অবাস্তব। এমনকি পরবর্তী সরকারও অর্থনৈতিক কাঠামো ঠিক করে তা বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।
ড. সাহাদাত হোসেন মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামোর দাবি যৌক্তিক হলেও সরকারের ব্যর্থ ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত রাজস্ব সক্ষমতা সেই যৌক্তিক দাবিকে বাস্তব রূপ দিতে পারছে না। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শুরুতে অর্থনীতিকে নতুন দিগন্তে নিয়ে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত পরবর্তী সরকারের ওপর ছেড়ে দেওয়াই তার স্পষ্ট প্রমাণ।
দেশ এখন নির্বাচনের প্রাকমুহূর্তে রয়েছে উল্লেখ করে অধ্যাপক মোহাম্মদ আইনুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন আয়োজন, গণভোটের প্রস্তুতি, প্রশাসনিক খরচ—সব মিলিয়ে সরকারের ওপর ব্যয়ের চাপ বেড়েছে। তাই নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের জন্য আর্থিক জোগান নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। ফলে সরকার ধীরে ধীরে এই দায়িত্ব পরবর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিচ্ছে—এমনটাই এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বেতন বৃদ্ধি চাই না। বাজার মূল্যেরসাথে সাথে সামঞ্জস্য রেখে বাৎসরিক প্রবৃদ্ধি (ইনক্রিমেন্ট) নির্ধারণ করা।