বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক সমাজই সবচেয়ে বড় ভিত্তি। তাদের শ্রম, ত্যাগ আর মেধার ওপর দাঁড়িয়ে আছে প্রজন্মের জ্ঞানের স্তম্ভ। অথচ সেই শিক্ষক সমাজই বছরের পর বছর ধরে মৌলিক দাবিগুলো আদায়ে লড়ছেন রাস্তায়, রোদে, বৃষ্টিতে, আদালতের সামনে কিংবা সচিবালয়ের ফটকে। তাদের দাবি— মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া, ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা, এবং কর্মচারীদের জন্য ৭৫ শতাংশ উৎসব ভাতা— শুনতে যতটাই সাধারণ মনে হয়, বাস্তবে তা বাস্তবায়নের পথে সৃষ্টি হচ্ছে অদৃশ্য এক প্রাচীর।
সেই প্রাচীরের নাম— আমলাতন্ত্র। ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের পর্যবেক্ষণ: আমলারা বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন সম্প্রতি সাবেক শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ দৈনিক ইত্তেফাক-এ দেওয়া মন্তব্যে স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন—
“এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ২০% বাড়িভাড়া, ১,৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা ও ৭৫% উৎসব ভাতা বাস্তবায়নে মূল প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে আমলারা।”
তার ভাষায়, সরকারের সদিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও কিছু প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তা বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ফাইল আটকে রাখছেন, বাজেট জটিলতার কথা বলছেন, কিংবা নানাভাবে সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে বিলম্ব ঘটাচ্ছেন। ফলে শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবিগুলো বছরের পর বছর “বিবেচনাধীন” অবস্থায় পড়ে আছে।
ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ আরও বলেন—
“এই দেশের আমলারা প্রায়ই এমনভাবে কাজ করেন যেন তারা জনগণের নয়, বরং নিজেদের স্বার্থের রাষ্ট্র গড়ে তুলেছেন। প্রতিটি ভালো উদ্যোগেই তারা কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন।”
আমলাতন্ত্রের মূল বৈশিষ্ট্য হলো নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্বের একচেটিয়া প্রয়োগ। প্রশাসনিক জটিলতার আড়ালে আমলারা প্রায়ই এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেন, যেখানে নীতি প্রণয়নকারীরা বা জনগণের প্রকৃত দাবিদাররা কার্যত অসহায় হয়ে পড়েন।
শিক্ষকদের দাবি পূরণের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যাচ্ছে—
এ থেকে স্পষ্ট— সমস্যা টাকার নয়, মানসিকতার। আমলাতান্ত্রিক মনোভাব শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নকে একটি “ফাইল” বা “দপ্তরীয় প্রক্রিয়া”র মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সরকারি শিক্ষকদের মতো একই পাঠদান করেন, একই পাঠ্যসূচি অনুসরণ করেন, একই বোর্ডের অধীনে পরীক্ষা নেন। তবুও তাদের প্রাপ্য ভাতা ও সুবিধা অর্ধেক বা তারও কম।
অতএব, এই তিন দফা দাবিকে শুধু আর্থিক নয়, বরং নৈতিক ন্যায্যতার প্রশ্ন হিসেবেও দেখা উচিত।
ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের বক্তব্য ইঙ্গিত দেয় এক গভীর সমস্যার দিকে— ব্যক্তিস্বার্থ ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার।
কেন আমলারা এমন বাধা দেন? কারণগুলো হতে পারে—
আমলাতন্ত্র ভাঙা সহজ নয়, কিন্তু নীতিনির্ধারক ও জনগণ একসাথে চাপ সৃষ্টি করলে পরিবর্তন সম্ভব।
কিছু বাস্তব পদক্ষেপ হতে পারে—
ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদের সতর্কবাণী কেবল শিক্ষক সমাজের জন্য নয়; এটি বাংলাদেশের প্রতিটি নীতি-সংশ্লিষ্ট নাগরিকের জন্যও একটি বার্তা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা শুধু শিক্ষকদের নয়, বরং রাষ্ট্রের উন্নয়নকেও বাধাগ্রস্ত করে।
শিক্ষকদের প্রাপ্য মর্যাদা নিশ্চিত করা মানে শুধু কিছু টাকার হিসাব নয়—
এটি হচ্ছে মানবসম্পদের প্রতি সম্মান এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্বের প্রতিফলন।
যেদিন আমরা আমলাতন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে শিক্ষা ও ন্যায্যতার আলো পৌঁছে দিতে পারব, সেদিনই প্রকৃত অর্থে বাংলাদেশ হবে এক “শিক্ষিত ও মানবিক রাষ্ট্র”।
Leave a Reply