বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির আন্দোলন এখন দেশের শিক্ষা অঙ্গনে সবচেয়ে আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। এই দাবিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় “যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত” বলে স্বীকার করলেও অর্থ মন্ত্রণালয়ের আপত্তির কারণে বিষয়টি বাস্তবায়ন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. সি. আর. আবরার শিক্ষকদের দাবি নিয়ে গত কয়েকদিন ধরেই দফায় দফায় বৈঠক ও আলোচনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন। বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) তিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতাদের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন। সেখানে আন্দোলনরত শিক্ষক নেতারা তাদের দাবি ও আন্দোলনের পটভূমি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষকদের আশ্বস্ত করেন যে তিনি ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে দেখছেন এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করছেন।
তবে অর্থ মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই “সীমিত বাজেট বরাদ্দ” এবং “চলমান অর্থনৈতিক সংকট” যুক্তি দেখিয়ে বাড়ি ভাতা ৫ শতাংশের বেশি বাড়াতে রাজি নয়। তাদের মতে, বর্তমানে সরকার রাজস্ব ঘাটতির চাপে রয়েছে, ফলে একসঙ্গে এত বড় ভাতা বৃদ্ধি করলে অন্যান্য খাতে ভারসাম্য রক্ষা কঠিন হবে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, “যে শিক্ষক সমাজ দেশ গড়ে, তাদের প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত না করলে শিক্ষা ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা নষ্ট হবে।”
সূত্র জানায়, শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে অধ্যাপক আবরার উপস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাদের সঙ্গে এই বিষয়ে পরামর্শ করেন। তিনি শিক্ষকদের ২০ শতাংশের পরিবর্তে “সমঝোতার ভিত্তিতে অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাব” দেন। কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এখনো কোনো সবুজ সংকেত দেয়নি।
শনিবার সকালে আবারও তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। বিকেলে আরেক দফা বৈঠকের পরিকল্পনাও রয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, “আমরা চাইছি, শিক্ষকরা যেন তাদের আন্দোলন আপাতত স্থগিত রাখেন। আলোচনার প্রক্রিয়া ইতিবাচক দিকে যাচ্ছে, যদিও সময় লাগছে। কিন্তু শিক্ষক সমাজের মধ্যে আস্থার ঘাটতি তৈরি হওয়ায় তারা অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।”
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“শিক্ষকদের প্রতি সরকারের অবস্থান কখনোই নেতিবাচক নয়। আমরা দফায় দফায় আলোচনায় বসেছি, কিন্তু অর্থ মন্ত্রণালয় এখনও তাদের অবস্থান থেকে সরেনি। আমরা চাই অন্তত ১০ শতাংশ বাড়ি ভাতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা করা হোক। শিক্ষকরা এখন যদি অনশন স্থগিত করেন, তাহলে আমরা আরও কার্যকরভাবে তাদের দাবিকে সামনে নিতে পারব।”
এদিকে, শিক্ষক-কর্মচারীরা সরকারের বিলম্বে ক্ষুব্ধ। শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে তারা কালো পতাকা মিছিল ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন। বৃষ্টি উপেক্ষা করে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে মিছিল শুরু হয়ে জাতীয় ঈদগাহের কদম ফোয়ারা মোড়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানেই এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন শিক্ষক নেতারা।
সমাবেশে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজীজি, যিনি এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব, সরকারের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে শিক্ষকদের দাবিকে ব্যবহার করে এক শ্রেণির আমলা রাজনৈতিক খেলা খেলছে। শিক্ষকদের মুখোমুখি করে সরকারকে বিব্রত করা এবং জাতীয় নির্বাচন বানচাল করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু শিক্ষক সমাজ কখনোই কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হবে না। আমাদের দাবি ন্যায়সঙ্গত, এবং আমরা ন্যায্য অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাব।”
তিনি আরও বলেন,
“অর্থ মন্ত্রণালয় যদি ৫ শতাংশে অনড় থাকে, তাহলে আমরা এই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করব। কারণ এখনকার ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় ৫ শতাংশ বৃদ্ধি হাস্যকর।”
উল্লেখ্য, ৫ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের মাত্র ৫০০ টাকা বাড়ি ভাতা বৃদ্ধি করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল। তখন থেকেই শিক্ষকরা আন্দোলনের ঘোষণা দেন। ১৩ অক্টোবর প্রেস ক্লাবের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর পুলিশ লাঠিচার্জ করলে আন্দোলন আরও তীব্র আকার ধারণ করে।
১৫ অক্টোবর শিক্ষকরা শাহবাগ মোড় আড়াই ঘণ্টা অবরোধ করেন। তখন তারা ঘোষণা দেন, “দাবি না মানলে যমুনা অভিমুখে লংমার্চ করব।” তবে পরদিন শিক্ষা উপদেষ্টা ড. আবরারের সঙ্গে বৈঠকের পর আপাতত ‘যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা’ কর্মসূচি স্থগিত রাখেন।
বর্তমানে শিক্ষকরা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশন ও অবস্থান কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিদিন সকাল থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শত শত শিক্ষক-কর্মচারী সেখানে অবস্থান করছেন। কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেও অনশন ভাঙতে রাজি নন।
এমপিও আন্দোলনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাদের তিন দফা দাবি হলো—
১️⃣ মূল বেতনের ২০ শতাংশ হারে বাড়ি ভাতা বৃদ্ধি,
২️⃣ চিকিৎসা ভাতা ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৫০০ টাকা,
৩️⃣ কর্মচারীদের উৎসব ভাতা ৭৫ শতাংশে উন্নীতকরণ।
এদিকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, তারা শিক্ষকদের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব পোষণ করে এবং আলোচনার মাধ্যমে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অনমনীয়তা ভাঙার চেষ্টা করছে। অন্যদিকে শিক্ষক নেতারা জানিয়েছেন, “প্রজ্ঞাপন জারি না হওয়া পর্যন্ত অনশন চলবে।”
পরিস্থিতি এখন দুই মন্ত্রণালয়ের টানাপোড়েন ও শিক্ষকদের অনড় অবস্থানের মধ্যকার এক জটিল অচলাবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি মহলে আশঙ্কা, দ্রুত সমাধান না হলে এই আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে—যা শুধু শিক্ষা খাত নয়, সামগ্রিক প্রশাসনিক স্থিতিশীলতার ওপরও গুরুতর প্রভাব ফেলতে পারে।
Leave a Reply