বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন এখন এক সংকটপূর্ণ ও সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধির দাবিতে তারা টানা সাত দিন ধরে রাজধানীর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অবস্থান করছেন। দিনরাত এক করে শত শত শিক্ষক সেখানে অবস্থান নিচ্ছেন, কেউ কেউ উপবাস অবস্থায় আছেন। অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়লেও আন্দোলন থেকে সরছেন না। সরকারের প্রতি গভীর হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
দীর্ঘ সাত দিনের আন্দোলনের পরও যখন তাদের ন্যায্য দাবির প্রজ্ঞাপন জারি হয়নি, তখন শনিবার (১৮ অক্টোবর) সকালে আন্দোলনকারীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটে আন্দোলনের অন্যতম নেতা এবং এমপিওভুক্ত শিক্ষা জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের সদস্য সচিব অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একটি তীব্র সমালোচনামূলক স্ট্যাটাস দেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়ার প্রজ্ঞাপন ইচ্ছাকৃতভাবে আটকে রেখেছেন প্রশাসনের চারজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা— সেলিম, জাকির, বাহাউদ্দীন ও মোমতাজ।
তিনি লেখেন, “২০% বাড়ি ভাড়ার প্রজ্ঞাপন আটকে দিয়েছে সেলিম, জাকির, বাহাউদ্দীন ও মোমতাজিরা। আমাদের ন্যায্য অধিকারের বিপক্ষে যারা অবস্থান নিয়েছে, সময় এসেছে এদের বর্জন করার।”
এই বক্তব্যের পর শিক্ষক মহলে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। অনেক শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এই চারজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
এদিকে একই দিন দুপুরে আন্দোলনকারীরা নতুন কর্মসূচি হিসেবে কালো পতাকা মিছিলের ঘোষণা দেন। অধ্যক্ষ আজিজী আরেকটি ফেসবুক পোস্টে লিখেন,
“সবাই কালো পতাকা নিয়ে আসুন। দুপুর ১২টায় কালো পতাকা মিছিলের মাধ্যমে শিক্ষকদের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলার প্রতিবাদ জানানো হবে। সবাই চলে আসুন।”
নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুপুরে শহীদ মিনার চত্বর কালো পতাকায় ভরে যায়। হাজারো শিক্ষক-কর্মচারী “ন্যায্য দাবি মেনে নাও”, “শিক্ষক অবমাননা চলবে না” ইত্যাদি স্লোগানে মুখর করে তোলেন পুরো এলাকা। উপস্থিত অনেক শিক্ষক কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, তারা জীবন দিয়ে হলেও দাবি আদায় করে ছাড়বেন।
এর আগে শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) দুপুরে প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই শিক্ষকরা শহীদ মিনারে অনশন শুরু করেন। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে শত শত শিক্ষক ও কর্মচারী রাত্রিবাস করেন সেখানে। দিনভর অবস্থান কর্মসূচির পর বিকেলে অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী ঘোষণা দেন, “যমুনা অভিমুখে পদযাত্রা” আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে, তবে এর মানে এই নয় যে আন্দোলন বন্ধ হবে।
তিনি জানান, “সরকার আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করছে। আমরা অপেক্ষা করেছি, অনুরোধ করেছি, কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারি না করে তারা শিক্ষক সমাজকে অপমান করছে। তাই সারাদেশের সব এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস, পরীক্ষা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে—এটাই হবে আমাদের প্রতিবাদ।”
এর ফলে সারাদেশের প্রায় ৩৫ হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কার্যত অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা স্কুলে গিয়ে তালা ঝুলানো দেখতে পাচ্ছেন। আন্দোলনরত শিক্ষকরা বলছেন, তারা এখন আর আশ্বাসে নয়, লিখিত প্রজ্ঞাপন ছাড়া বাড়ি ফিরবেন না।
শিক্ষক নেতারা অভিযোগ করেছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে নেওয়া হলেও কয়েকজন আমলা সচেতনভাবে তা বাস্তবায়ন ঠেকিয়ে রাখছেন। তারা আন্দোলনকে দীর্ঘায়িত করতে চাইছেন। অন্যদিকে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অর্থ মন্ত্রণালয় ও প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের মধ্যে এখনো সমন্বয় হয়নি, ফলে প্রজ্ঞাপন জারি ঝুলে আছে।
অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন আজিজী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন—
“শিক্ষকদের ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে যাচ্ছে। যদি দ্রুত প্রজ্ঞাপন না আসে, তাহলে আমরা বাধ্য হব আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে। এবার আর শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশেই প্রশাসনিক ভবন ঘেরাও করা হবে।”
মাঠপর্যায়ের শিক্ষকরাও ঘোষণা দিয়েছেন, যদি ২০ শতাংশ বাড়ি ভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা বৃদ্ধির প্রজ্ঞাপন অবিলম্বে প্রকাশ না করা হয়, তবে তারা ‘যমুনা ঘেরাও’ কর্মসূচি পালন করবেন।
শিক্ষক সমাজের অনেকে বলছেন, এটি শুধু টাকার দাবি নয়, এটি মর্যাদা ও ন্যায়ের লড়াই। তারা প্রশ্ন তুলছেন— “শিক্ষকরা যদি আজ রাস্তায় বসতে বাধ্য হন, তাহলে জাতি কীভাবে শিক্ষা পাবে?”
এই আন্দোলন তাই এখন আর শুধু এমপিও শিক্ষকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি পরিণত হয়েছে শিক্ষা খাতে ন্যায্যতা ও মর্যাদার বৃহত্তর আন্দোলনে।
Leave a Reply