মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়ি ভাতা ভাতার দাবিতে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্দোলন ষষ্ঠ দিনে গড়িয়েছে। রাজধানী থেকে শুরু করে বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় শিক্ষকরা মানববন্ধন, অবস্থান কর্মসূচি, মিছিল ও লংমার্চের মাধ্যমে তাদের দাবি আদায়ের সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। শিক্ষক নেতাদের দাবি— বর্তমান মূল্যস্ফীতির বাজারে ৫ শতাংশ বা নামমাত্র বাড়ি ভাতা তাদের জীবনের সঙ্গে তামাশা ছাড়া কিছু নয়। তারা বলছেন, “বাড়ি ভাড়া বাড়ে প্রতি বছর, কিন্তু আমাদের ভাতা বাড়ে বছর দশেক পরেও কেবল সামান্য অঙ্কে।”
এই আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতি জানিয়ে ইতোমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, মানবাধিকার কর্মী ও প্রাক্তন শিক্ষকরা একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। কেউ কেউ আন্দোলন স্থগিত না করে সরকারকে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারির আহ্বান জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে আজ শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) সকালে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি সেক্রেটারি আজাদ মজুমদার।
সকাল ১০টার পর নিজের অফিসিয়াল ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি দীর্ঘ পোস্টে তিনি লিখেছেন,
“এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যে বাড়ি ভাতা বাড়ানোর দাবি তুলেছেন, সেটি কোনো অযৌক্তিক দাবি নয়। বরং একে আমি যথেষ্ট বাস্তবসম্মত দাবি বলব। আমি নিজে গ্রামে বড় হয়েছি, গ্রামের স্কুলে পড়েছি, গ্রামের শিক্ষকদের জীবনের কষ্ট, তাদের নীরব সংগ্রাম কাছ থেকে দেখেছি। যেভাবে তারা সীমিত আয়ে সংসার চালান, সন্তানদের পড়ান, আবার স্কুলে গিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়েন— তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের বাড়ি ভাতার এই সামান্য দাবিটি পূরণ করতে পারলে সেটা সবার জন্য আনন্দের হবে।”
তবে তিনি একইসঙ্গে সতর্ক করেছেন, “শিক্ষকরা যদি এই দাবি আদায়ের আন্দোলনের নামে জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করেন, তাহলে তা অত্যন্ত দুঃখজনক হবে। কারণ শিক্ষক সমাজ সব সময় সমাজের বিবেক। তাদের আন্দোলনও হওয়া উচিত দায়িত্বশীল ও শৃঙ্খলাবদ্ধ।”
আজাদ মজুমদার বলেন, “সরকার ইতোমধ্যেই শিক্ষকদের দাবিগুলো বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। পর্যায়ক্রমে তাদের বাড়ি ভাতা কীভাবে বৃদ্ধি করা যায়, সেই প্রক্রিয়া এখন চলমান। আপাতত পাঁচ শতাংশ বাড়ানো প্রস্তাব আছে, যার সঙ্গে ন্যূনতম ২,০০০ টাকা নির্ধারণের কথাও বলা হয়েছে। এই প্রস্তাব অনুযায়ী যাদের মূল বেতন ২০ হাজার টাকার কম, তাদের বাড়ি ভাতা কার্যত ১০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে। তাই এ প্রস্তাব শিক্ষক সমাজের বড় অংশের জন্য উল্লেখযোগ্য উপকার বয়ে আনবে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আগামী বাজেটের আগেই আরও পাঁচ শতাংশ বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রাথমিক আলোচনা চলছে। তবে শিক্ষকদের কিছু সংগঠন এখনই পুরো ২০ শতাংশ বাস্তবায়ন চায়। সরকার চায় বাস্তবতার মধ্যে থেকে টেকসই সমাধান দিতে। এখন প্রশ্ন হলো— অর্থনৈতিক বাস্তবতা, রাজস্ব সীমাবদ্ধতা ও মুদ্রাস্ফীতি— এসব বিষয় বিবেচনা না করে হঠাৎ পুরো ২০ শতাংশ দেওয়া কতটা সম্ভব?”
পোস্টে তিনি এমপিওভুক্তির স্বচ্ছতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। বলেন,
“আমাদের এটাও ভাবতে হবে— এমপিওভুক্ত হয়েছেন কারা? অনেক প্রতিষ্ঠানই রাজনৈতিক বিবেচনা, তদবির ও ব্যক্তিগত প্রভাবের জোরে এমপিওভুক্ত হয়েছে। এমন অনেক বিদ্যালয় বা কলেজ আছে যেখানে ছাত্রসংখ্যা হাতে গোনা, শিক্ষক ক্লাসে যান না, অথচ তারা নিয়মিত এমপিও সুবিধা ভোগ করছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান তো কেবল একটি টিনের ছাপড়া ঘরেই ‘বিদ্যালয়’ নাম ধারণ করেছে!”
তিনি আরও বলেন,
“শিক্ষার মান যেখানে ভয়াবহভাবে নিম্নগামী, সেখানে জনগণের টাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের বাড়তি সুবিধা দেওয়া কতটা যৌক্তিক— সেটা ভেবে দেখা দরকার। সম্প্রতি প্রকাশিত এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফলেই দেখা গেছে, দেশের ২০০টিরও বেশি কলেজে একজনও পাস করেনি। এসএসসিতেও একই পরিস্থিতি। এ অবস্থা কোনো আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার জন্য লজ্জাজনক। যেসব প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর শিক্ষার মান ধরে রাখতে ব্যর্থ, যাদের ছাত্ররা ন্যূনতম দক্ষতাও অর্জন করতে পারে না— সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকদের জন্য অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ দেওয়ার আগে আমাদের নিশ্চিত হতে হবে তারা আদৌ এমপিওর যোগ্য কিনা।”
আজাদ মজুমদার বলেন, “যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সরকার নির্ধারিত ক্রাইটেরিয়া পূরণ করে এমপিওভুক্ত হয়েছে, সরকার তাদের ন্যায্য দাবি অবশ্যই বিবেচনা করবে। কিন্তু যেসব প্রতিষ্ঠান কেবল তদবির বা রাজনৈতিক আনুকূল্যের কারণে তালিকাভুক্ত হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন জরুরি হয়ে পড়েছে। এখন সময় এসেছে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্তের, যাতে বোঝা যাবে কারা সত্যিকার অর্থে যোগ্য শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠান।”
শেষে তিনি আহ্বান জানান,
“শিক্ষকরা জাতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ— এ কথা সবাই জানে। কিন্তু তাদের আন্দোলন যেন শিক্ষা ব্যবস্থার ভাবমূর্তি নষ্ট না করে, সে দিকেও খেয়াল রাখতে হবে। সরকারও শিক্ষক সমাজকে বিরোধী নয়, বরং অংশীদার হিসেবে দেখতে চায়। দাবি-দাওয়া থাকবে, আলোচনা-সমঝোতাও হবে— কিন্তু তা হতে হবে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও বাস্তবসম্মত।”
এই মন্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক শিক্ষক তার বক্তব্যকে “সংবেদনশীল” ও “বাস্তবধর্মী” হিসেবে দেখেছেন, আবার কেউ কেউ বলেছেন, “এটি সরকারের পক্ষ থেকে আন্দোলন দুর্বল করার কৌশল।” আন্দোলনরত শিক্ষকরা জানিয়েছে— তারা সরকারের ঘোষণার অপেক্ষায় থাকলেও দাবির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে।
Leave a Reply