বাংলাদেশের শিক্ষা অঙ্গনে বর্তমানে যে অচলাবস্থা বিরাজ করছে, তা কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া ঘটনা নয়। দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। মূল বেতনের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও উৎসব ভাতা—এই তিনটি মৌলিক দাবিই তারা বহুদিন ধরে তুলে আসছেন। অথচ এই ন্যায্য দাবির প্রতি সরকারের শিক্ষা উপদেষ্টার নীরবতা এখন শিক্ষক সমাজের ক্ষোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
যে শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষক সমাজের অভিভাবক হওয়ার কথা, যিনি তাদের সমস্যার প্রতি সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল থাকার কথা—দুঃখজনকভাবে, তিনি আজ সম্পূর্ণ উদাসীন। তিন দিন ধরে দেশের হাজারো শিক্ষক শহীদ মিনার, প্রেসক্লাব ও সড়কে অবস্থান করছেন। কেউ রোদে পুড়ছেন, কেউ ভিজছেন বৃষ্টিতে, কেউ আবার রাত কাটাচ্ছেন খোলা আকাশের নিচে। অথচ শিক্ষা উপদেষ্টা যেন এসবের কিছুই জানেন না । তাঁর দৃষ্টিতেও এসবের প্রতিফলন নেই। তিনি যেন এক অদৃশ্য দূরত্বে থেকে সবকিছু দেখছেন, অথচ কিছুই করছেন না। শুধু কি তাই গত ১২ তারিখ শিক্ষকরা যখন তাদের ন্যর্য দাবী নিয়ে প্রেস ক্লাবে উপস্থিত হয়েছিল তখন তাদের অদৃশ্য কোন শক্তির নির্দেশনা মোতাবেক লাঠিচার্জ, গরম পানি নিক্ষেপ, সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ সহ শিক্ষকদের গায়ে হাত তুলতেও ছাড়েনি এই দেশের পুলিশ। ঠিক তখন নির্বিকার আমাদের এই মহান শিক্ষা উপদেষ্টা।
এই শিক্ষা উপদেষ্টাই আগে মৌখিক ও নীতিগতভাবে শিক্ষকদের দাবি মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু বাস্তবে সেই আশ্বাসের কোনও প্রতিফলন দেখা যায়নি। উল্টো কিছু আমলা নানা কুটকৌশল অবলম্বন করে বিষয়টি জটিল করে তুলছেন, আর শিক্ষা উপদেষ্টা তা নির্বিকারভাবে দেখছেন। শিক্ষকদের বিশ্বাস ছিল, অন্তত উপদেষ্টা তাদের পাশে দাঁড়াবেন, কারণ তিনিই নীতিনির্ধারণে সরকারের শিক্ষাবিষয়ক প্রধান সহায়ক। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, তার ভূমিকা যেন কেবল দর্শকের—একজন উপদেষ্টার দায়িত্বশীল ভূমিকা নয়।
দেশজুড়ে এখন হাজার হাজার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কার্যত অচল। এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা পাঠদান বন্ধ রেখেছেন। শিক্ষা কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে, শিক্ষার্থীরা অনিশ্চয়তায়, অথচ শিক্ষা উপদেষ্টা রয়েছেন নির্বিকার। অফিসের ঠান্ডা কক্ষে বসে তিনি হয়তো প্রশাসনিক পরামর্শ দিচ্ছেন, কিন্তু মাঠের বাস্তবতায় তার কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
এমন এক সময়, যখন শিক্ষকদের আন্দোলন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় সংকটে পরিণত হয়েছে, তখন শিক্ষা উপদেষ্টার নীরবতা কেবল অবহেলা নয়—এটি এক ধরনের প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক। একজন শিক্ষা উপদেষ্টা যদি শিক্ষকদের মৌলিক অধিকারের বিষয়ে সচেতন না হন, যদি তিনি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হন, তবে তার পদে থাকার নৈতিক ভিত্তিই বা কোথায়?
তাই আজ শিক্ষক সমাজের মধ্যে এই প্রশ্ন তীব্রভাবে উঠেছে—যে শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষকদের প্রতি দায়িত্বশীল নন, তাদের ন্যায্য দাবিতে কোনো পদক্ষেপ নিতে অনাগ্রহী, সেই উপদেষ্টার পদত্যাগ চাওয়া কি অন্যায়? বরং এটাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি। কারণ শিক্ষা উপদেষ্টার এই উদাসীনতা শিক্ষকদের প্রতি কেবল অন্যায় নয়, এটি দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি এক গুরুতর অবিচার।
শিক্ষকদের দাবি এখন কেবল তিনটি ভাতা নয়, এটি ন্যায্য অধিকার, মর্যাদা ও সম্মানের প্রতীক। আর যারা সেই অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ—তাদের দায়িত্বে থাকা আর নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
Leave a Reply