পৃথিবীর বহু দেশে শিক্ষকদের মর্যাদা, অধিকার ও মৌলিক চাহিদা রক্ষায় সরকারগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাংলাদেশ যেন সেই ব্যতিক্রমী দেশ যেখানে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে বছরের পর বছর নানা টালবাহানা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর ছলচাতুরীর আশ্রয় নেওয়া হয়। এ যেন প্রশাসনের এক ধরনের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। যে প্রশাসন দেশের বৃহত্তম একটি পেশাজীবী শ্রেণির অভিভাবক হওয়ার কথা, তারাই বারবার মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে শিক্ষকদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করছে। এর ফলে শিক্ষকদের কাছে প্রশাসনের প্রতি আস্থা, শ্রদ্ধা নয় বরং ঘৃণাই জন্ম নিচ্ছে।
সম্প্রতি জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতৃবৃন্দ যখন শিক্ষা প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তার সাথে ‘শ্রান্তি ও বিনোদন ভাতা’ প্রসঙ্গে আলোচনা করেন, তখন কর্মকর্তারা যুক্তি দেখান—“আপনারা তো ভাতা পান, তাই এর সাথে আরেকটি ভাতা যুক্ত করলে তা আইনের পরিপন্থি হবে।” অথচ প্রশ্ন উঠছে, যারা এ ধরনের যুক্তি দেখান তারাই কি সবসময় আইন মেনে চলেন? তাদের অনিয়ম, দুর্নীতি, অবৈধ উপার্জন কি আইনের পরিপন্থি নয়? আইন কেবল শিক্ষকদের দাবী প্রত্যাখ্যানের অজুহাত হিসেবেই ব্যবহার করা হয়, কিন্তু নিজেদের ক্ষেত্রে যেন আইন নিছক একটি বইয়ের ধুলো জমা অধ্যায়।
বাংলাদেশের সংবিধান প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার, বৈষম্যহীনতা ও আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী। অর্থাৎ এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ন্যায্য দাবি দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষা করা হলে তা সরাসরি এই মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। সংবিধানের ২৯ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, রাষ্ট্রের কর্মে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য করা যাবে না এবং যোগ্যতা ব্যতীত কারও প্রতি সুযোগ-সুবিধা সীমিত করা যাবে না। অথচ বাস্তবে সরকারি চাকরিজীবীরা সমান হারে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা ভোগ করছেন, কিন্তু একইভাবে দায়িত্ব পালন করা এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত—যা স্পষ্ট বৈষম্যের শামিল। সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রতিটি নাগরিক আইনানুগভাবে জীবনের নিরাপত্তা, স্বাধীনতা ও অধিকার ভোগ করবে এবং আইনের আশ্রয় প্রাপ্তির অধিকার রাখবে। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা যদি তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হন, তবে তা তাঁদের সাংবিধানিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের অধিকার হরণ করে। সুতরাং, শিক্ষকদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা কেবল প্রশাসনিক অবিচার নয়, বরং তা দেশের সংবিধানবিরোধী কার্যক্রমও বটে।
এখন প্রশ্ন হলো—কতদিন এভাবে অবহেলা, বৈষম্য আর অন্যায়ের শিকার হবেন শিক্ষক সমাজ? দীর্ঘ দশক ধরে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার যন্ত্রণা কি আর সহ্য করা সম্ভব? আজকের বাস্তবতা হলো, আমরা এমন এক জায়গায় এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে আর পিছিয়ে আসার পথ নেই। আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন একমাত্র পথ হলো সামনে এগিয়ে যাওয়া, ঐক্যবদ্ধভাবে ন্যায্য দাবী আদায় করা।
তবে এবারের আন্দোলন শুধু প্রশাসনিক বাধার সম্মুখীন নয়, বরং ভেতর থেকেও কিছু প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে। কিছু অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মী এবং বিভক্ত গোষ্ঠী পথকে আরও কঠিন করে তুলছে। তবুও হতাশ হওয়ার সময় এখন নয়। ইতিহাস প্রমাণ করেছে, যে কোনো আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সফল হয়েছে। আমরাও জয়ী হব—এটা শুধু আশাবাদ নয়, দৃঢ় বিশ্বাস।
জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের নেতৃত্ব দৃঢ় ও অকুতোভয়। তাদের মধ্যে সততা, নিষ্ঠা ও আত্মত্যাগের মানসিকতা রয়েছে। আর সত্যিকার সততা কখনো ব্যর্থ হয় না, খালি হাতে কাউকে ফেরায় না। এজন্যই বিশ্বাস করা যায়—এই নেতৃত্বের অধীনেই আমাদের আন্দোলন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছাবে।
জোট ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছে, আগামী ১২ অক্টোবর থেকে তারা রাজপথে ন্যায্য অধিকার আদায়ের কর্মসূচি শুরু করবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা কোনো সমাধান দেয়নি, কোনো প্রজ্ঞাপন জারি করেনি। তাই এখন রাজপথই একমাত্র ভরসা। প্রেসক্লাব হবে আমাদের মহাযজ্ঞের কেন্দ্রবিন্দু, যেখানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা একত্রিত হয়ে শক্তিশালী বার্তা দেবেন—“আমরা আর বিভক্ত নই, আমরা এক।”
এ বিষয়ে জাতীয়করণ প্রত্যাশী জোটের অবস্থান একেবারেই স্পষ্ট। তারা ঘোষণা দিয়েছে, আমাদের দাবী এখন একটাই—
এর এক কানাকড়িও কম হলে তারা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে নারাজ। এবং এই দাবী পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তারা রাজপথ ছাড়বে না। এটাই তাদের দৃঢ় অঙ্গীকার এবং এই অবস্থান থেকেই তারা আন্দোলন পরিচালনা করছে।
অতএব, প্রিয় সহকর্মীবৃন্দ, দ্বিধা নয়, বিভক্তি নয়, হতাশা নয়। আসুন আমরা সবাই একত্রিত হই। আগামী ১২ অক্টোবর প্রেসক্লাবে উপস্থিত হই এবং প্রমাণ করি যে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আর অবহেলার শিকার নয়, তারা নিজেদের অধিকার আদায়ে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। আমাদের এই ঐক্যই হবে আগামী দিনের সংগ্রামের সবচেয়ে বড় শক্তি।
এখন সময় দাবি আদায়ের, সময় ইতিহাস গড়ার।
Leave a Reply