বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় সবচেয়ে বড় অসাম্য যদি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তা হলো বেতন ও ভাতার ক্ষেত্রে চরম বৈষম্য। একই দেশের নাগরিক, একই দেশের কর্মচারী—কিন্তু একজন আমলার মাসিক প্রাপ্তি এবং একজন শিক্ষকের মাসিক প্রাপ্তি তুলনা করলে বিষয়টি যেন আকাশ-পাতালের পার্থক্য হয়ে দাঁড়ায়।
গ্রেড-২ পর্যায়ের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা মাস শেষে যেসব সুবিধা ভোগ করেন তা এক নজরে দেখলেই বোঝা যায়, এখানে ‘সুবিধা’ নামেই যেন চলছে একেকটি প্রাসাদ।
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। এ ছাড়া আরও রয়েছে—
সবকিছু যোগ করলে মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকারও বেশি সুবিধা ভোগ করেন একজন আমলা। বাস্তবে এ টাকা শুধু তাঁর বেতনে সীমাবদ্ধ থাকে না; সরকারি গাড়ি, সরকারি বাসভবন, চালক, দারোয়ান, অফিস সহায়ক, সরকারি খরচে বিদেশ ভ্রমণ, নানা প্রকল্পের মাধ্যমে অতিরিক্ত আয়—সব মিলিয়ে আমলাদের জীবনে বিলাসিতার অন্ত নেই।
অন্যদিকে, এমপিওভুক্ত একজন শিক্ষক—যিনি গ্রামে কিংবা শহরে শিক্ষার্থীদের পড়ান, দেশের ভবিষ্যৎ তৈরি করেন—তিনি মাস শেষে পান মাত্র ১২,৫০০ টাকা। ভাতার নামমাত্র কিছু নেই। বাড়িভাড়া ভাতা, চিকিৎসা ভাতা, পরিবহন সুবিধা কিংবা ইন্টারনেট ভাতা—কিছুই মেলে না। তাঁর সামান্য বেতন বৃদ্ধির দাবিতেই শুরু হয় আমলাদের নানা অজুহাত, নানা ষড়যন্ত্র। বলা হয়—“টাকা নেই, বাজেট সংকট, অর্থনৈতিক চাপ।”
কিন্তু প্রশ্ন হলো—একই বাজেট থেকে যদি একজন আমলার জন্য কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ করা যায়, তাহলে একজন শিক্ষকের জন্য কেন সামান্য টাকাও বরাদ্দ করা যায় না? কেন তাঁরা সবসময় বঞ্চিত থেকে যান?
১. মনোবল ভাঙা: শিক্ষকরা যখন মাস শেষে সংসার চালাতে হিমশিম খান, তখন তাঁদের কাজে উদ্যম থাকে না।
২. শিক্ষার মানের অবনতি: শিক্ষকেরা জীবিকার চাপ সামলাতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের যথেষ্ট সময় দিতে পারেন না।
৩. সমাজে মর্যাদা হ্রাস: কম বেতন শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছে। সমাজে ‘শিক্ষক’ পেশার প্রতি আকর্ষণ দিন দিন কমছে।
৪. মেধা পাচার: যারা মেধাবী, তারা শিক্ষকতা পেশায় না এসে অন্য খাতে চলে যাচ্ছেন। এর ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপযুক্ত গুণগত শিক্ষকের অভাবে পড়ছে।
অরাজনৈতিক সরকার আসার পর অনেকেই ভেবেছিলেন অন্তত বৈষম্যের এই পাহাড় কিছুটা হলেও কমবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো উল্টো। আমলারা আরও বেশি ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছেন, নিজেদের জন্য সুবিধা বাড়িয়েছেন বহুগুণে, আর শিক্ষকদের বঞ্চনা রয়ে গেছে আগের মতোই। বলা যায়—“এই সরকারের আমলে শিক্ষকরা শুধু প্রতিশ্রুতির রাজনীতি পেয়েছেন, বাস্তব কোনো পরিবর্তন পাননি।”
শিক্ষকরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলেন, অথচ তাঁদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা হচ্ছে। অন্যদিকে, আমলাদের জন্য প্রতিনিয়ত ভাতা, সুবিধা, বিলাসিতা বাড়ছে। এই চরম বৈষম্য কেবল শিক্ষক সমাজের নয়, বরং দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি মরণঘাতী সংকেত।
যদি এখনই শিক্ষকদের জন্য ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রণয়ন না করা হয়, তবে শিক্ষা খাত ভেঙে পড়বে, মেধাবীরা শিক্ষকতা থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে, আর দেশের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
এটাই এখন সময়ের দাবি—শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়াতে হবে, তাঁদের প্রাপ্য সম্মান নিশ্চিত করতে হবে। নইলে বৈষম্যের এই অন্ধকার রাষ্ট্রকেই গ্রাস করবে।
Leave a Reply