বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা বরাবরই অবহেলার শিকার। দীর্ঘদিন ধরে তারা দাবি জানিয়ে আসছেন—বাড়িভাড়া ভাতা যেন মূল বেতনের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়। শিক্ষকেরা বলেছেন, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাজারমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, তাতে নির্দিষ্ট অঙ্কের ভাতা কোনোভাবেই আর যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে ঢাকাসহ বড় শহরে যেখানে ভাড়ার চাপ সাধারণ চাকরিজীবীদের গলাকাটা পরিস্থিতিতে ফেলে দিচ্ছে, সেখানে ২০ শতাংশ ভাতা চাওয়া মোটেও অযৌক্তিক নয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, অর্থ মন্ত্রণালয় শিক্ষকদের এই দীর্ঘদিনের দাবি পাশ কাটিয়ে ৫০০ টাকা বাড়িয়ে একটি পরিপত্র জারি করল। পূর্বের ১,০০০ টাকা থেকে বাড়িভাড়া এখন হলো ১,৫০০ টাকা। নিঃসন্দেহে এটি শিক্ষক সমাজের কাছে একধরনের প্রহসন ছাড়া আর কিছুই নয়। যখন একটি শহরে একটি ছোট্ট বাসা ভাড়াই ১৫-২০ হাজার টাকার নিচে পাওয়া দুষ্কর, তখন সেখানে ৫০০ টাকার অতিরিক্ত ভাতা বৃদ্ধি বাস্তবতার সঙ্গে কেবল বেমানানই নয়, বরং শিক্ষক সম্প্রদায়ের প্রতি এক ধরনের উপহাসও বটে।
তবে এই প্রহসনের দিনেই নতুন এক আলোচনার সূচনা হয়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় একই দিনে অর্থ মন্ত্রণালয়ে একটি নতুন প্রস্তাব পাঠিয়েছে, যেখানে বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের হার মূল বেতনের ওপর ভিত্তি করে ৫, ১০, ১৫ ও ২০ শতাংশ করার সুপারিশ করা হয়েছে। অর্থাৎ একদিকে শিক্ষকদের হাতে প্রহসনের মতো ৫০০ টাকার পরিপত্র, অন্যদিকে তাদের প্রকৃত দাবির দিকে ইঙ্গিত করে নতুন প্রস্তাব।
প্রশ্ন হলো—শিক্ষকরা কি অবশেষে তাদের ন্যায্য দাবি বাস্তবায়নের পথে কোনো আলোর দেখা পাবেন, নাকি এই প্রস্তাবও কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে? অভিজ্ঞরা বলছেন, যদি সত্যিই শতাংশভিত্তিক ভাতা কার্যকর হয়, তবে শিক্ষকদের জীবনে তা এক বড় পরিবর্তন আনবে। এতে শহর ও গ্রামভেদে আয়-ব্যয়ের ভারসাম্য কিছুটা হলেও রক্ষা পাবে।
এখানে বড় বিষয় হলো নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি। সরকার যখন একদিকে বারবার শিক্ষা ব্যবস্থার মান উন্নয়নের কথা বলে, তখন শিক্ষকদের মৌলিক চাহিদা পূরণে এমন অবহেলা রাষ্ট্রের অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। শিক্ষক সমাজের অবমাননা মানে শিক্ষা ব্যবস্থার অবমাননা। শিক্ষকদের প্রাপ্য সম্মান আর যথাযথ ভাতা নিশ্চিত না করলে উন্নত জাতি গঠনের স্বপ্ন কেবল মুখের বুলি হয়েই থাকবে।
আজকের শিক্ষা দিবসে কিংবা বিশ্ব শিক্ষক দিবসের বক্তৃতায় আমরা শুনি—“শিক্ষক জাতির বিবেক।” কিন্তু সেই বিবেক যদি বাসা ভাড়া দিতে হিমশিম খায়, তাহলে শিক্ষকের মর্যাদা কোথায় দাঁড়াবে? তাই ৫০০ টাকার ভাতার এই প্রহসন থেকে দ্রুত বেরিয়ে এসে সরকারকে শিক্ষকদের জন্য একটি বাস্তবভিত্তিক, মানবিক এবং দীর্ঘমেয়াদি সমাধান গ্রহণ করতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নতুন প্রস্তাবটি তাই শুধু একটি কাগজ নয়, বরং শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার প্রতিফলন। এখন দেখা যাক, অর্থ মন্ত্রণালয় প্রহসনের বেড়াজাল ভেঙে শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসে কি না।
Leave a Reply