বিশ্ব শিক্ষক দিবস ২০২৫-এ শিক্ষা উপদেষ্টা চৌধুরী রফিকুল আবরারের ঘোষণার মাধ্যমে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তনের দ্বার উন্মোচিত হয়েছে—এবং সেই পরিবর্তন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ম্যানেজিং কমিটির ঐতিহ্যবাহী নিয়োগক্ষমতার সমাপ্তি টেনে দিয়েছে। এখন থেকে বেসরকারি স্কুল-কলেজের অধ্যক্ষ, উপাধ্যক্ষ ও প্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছে বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)।
এর আগে অশিক্ষক কর্মচারী নিয়োগে জারি করা পরিপত্রে জেলার ডিসির নেতৃত্বে সুপারিশ কমিটি গঠনের নির্দেশনা দিয়ে ম্যানেজিং কমিটির ভূমিকাকে কার্যত শেষ করে দেওয়া হয়। নতুন এই ঘোষণার ফলে একমাত্র শিক্ষক নয়, এখন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক পদগুলোতেও ম্যানেজিং কমিটির নিয়ন্ত্রণ আর থাকছে না।
দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার সঙ্গে সম্পৃক্ত স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ম্যানেজিং কমিটির মাধ্যমে নিয়োগ বাণিজ্যে যুক্ত ছিলেন বলে বিস্তর অভিযোগ ছিল। অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হওয়ায় ধাপে ধাপে সরকার নিয়োগ প্রক্রিয়া থেকে ম্যানেজিং কমিটিকে সরিয়ে আনছে। অনেকের মতে, এটি স্থানীয় স্বার্থ-ভিত্তিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার অবসান ঘটাবে। তবে আবার কেউ কেউ একে দেখছেন কেন্দ্রীয়করণ ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে, যা স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় না এনে একধরনের দূরত্ব সৃষ্টি করতে পারে।
গত ২৮ সেপ্টেম্বর জারি করা অশিক্ষক নিয়োগের পরিপত্রে জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে গঠিত কমিটিতে স্থান পেয়েছেন—
এই কমিটি নিয়োগ পরীক্ষা গ্রহণ, ফলাফল তৈরি ও নিয়োগের সুপারিশ প্রদান করবে। প্রয়োজনে মৌখিক পরীক্ষার জন্য নবম গ্রেডের কর্মকর্তাদের নিয়ে তিন সদস্যের আলাদা বোর্ডও গঠন করা যাবে। অর্থাৎ নিয়োগ এখন হবে একেবারেই প্রশাসনিক কাঠামোর অধীনে, যা মেধাভিত্তিক ও দুর্নীতিমুক্ত প্রক্রিয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতে, এই পদক্ষেপ গ্রহণের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। তবে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—ম্যানেজিং কমিটি এখন কী করবে? প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, নীতিনির্ধারণ, শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন—এই কাজগুলোতেও যদি তাদের প্রভাব না থাকে, তাহলে তাদের অস্তিত্ব কেবলই আনুষ্ঠানিক থেকে যাবে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন। যেখানে স্থানীয়ভাবে নিয়োগ নিয়ন্ত্রণকারী ম্যানেজিং কমিটির জায়গা নিচ্ছে রাষ্ট্রের নিরপেক্ষ প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। একদিকে এই পরিবর্তন দুর্নীতিমুক্ত নিয়োগ নিশ্চিতের প্রত্যাশা জাগাচ্ছে, অন্যদিকে এতে স্থানীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণ ও প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় দায়বদ্ধতা প্রশ্নের মুখে পড়ছে। এখন সময়ই বলে দেবে—এই রূপান্তর শিক্ষা ব্যবস্থার গুণগত উন্নয়নে কতটা কার্যকর হয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়োগ ব্যবস্থায় ‘ম্যানেজিং কমিটির যুগ’ শেষের পথে।
Leave a Reply