ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে নতুন এক সমীকরণ তৈরি হয়েছে। নির্বাচনী জোট গঠনের নানা আলোচনা ও তৎপরতা পর্দার আড়ালে গোপনে চললেও বিশেষ করে জুলাই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের হাতে গড়া নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। শুরুতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী জোটে যুক্ত হওয়ার গুঞ্জন উঠলেও এনসিপি ইতিমধ্যেই তা নাকচ করেছে। বরং বিএনপি-জামায়াত বলয়ের বাইরে থাকা শক্তিগুলোকে সঙ্গে নিয়ে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক জোট গঠনের পথে এগোচ্ছে দলটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, তরুণদের নেতৃত্বে দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় এক বলয় গড়ে ওঠার সম্ভাবনা প্রবল। বিশ্বব্যাপী তরুণদের জাগরণ এবং বাংলাদেশে জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের ঘটনাকে সামনে রেখে বিশ্লেষকেরা বলছেন—আগামী নির্বাচন ও রাজনীতিতে তরুণদের এই শক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম পর্যন্ত বলেছেন, তরুণদের এ নেতৃত্ব ভবিষ্যতে প্রথম সারির শক্তি হয়ে উঠলেও আশ্চর্যের কিছু থাকবে না।
ইতোমধ্যে এনসিপি গণঅধিকার পরিষদ, আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, ভাসানী পরিষদ, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ, ইনকিলাব মঞ্চসহ একাধিক দলের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক বৈঠক করেছে। এমনকি গণতন্ত্র মঞ্চের ছয়টি দল—গণসংহতি আন্দোলন, নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, জেএসডি ও ভাসানী জনশক্তি পার্টির সঙ্গে এনসিপি, এবি পার্টি ও গণঅধিকার পরিষদের বৈঠকও হয়েছে। এসব আলোচনায় বিএনপি-জামায়াত বলয়ের বাইরে বৃহত্তর জোট গঠনের কৌশল নিয়ে কথা হচ্ছে। গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে একীভূত হওয়ার কথাও আলোচনা পর্যায়ে আছে।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার বলেন, “আমরা মধ্যপন্থি, গণতান্ত্রিক ও বাংলাদেশপন্থি শক্তিগুলোকে নিয়ে নতুন বলয় গড়তে চাই। সেই বলয়ের কেন্দ্রবিন্দু হবে এনসিপি।” দলের অন্যান্য নেতারাও নিশ্চিত করেছেন—তাদের লক্ষ্য শুধু নির্বাচন নয়, বরং নতুন সংবিধান, গণহত্যার বিচার, জুলাই সনদ এবং সংস্কারমূলক দাবির ভিত্তিতে জোটবদ্ধ হয়ে আন্দোলন ও নির্বাচনে শক্ত অবস্থান তৈরি করা। পাশাপাশি জাতীয় পার্টি নিষিদ্ধের দাবিতেও মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে দলটি।
এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আরিফুর রহমান তুহিন বলেছেন, “বিএনপি-জামায়াতের বাইরে বাংলাদেশপন্থি শক্তিগুলো নিয়ে আমরা একটি স্বতন্ত্র জোট করব, এটি নিশ্চিত। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি, গণপরিষদ নির্বাচন, গণহত্যার বিচার ও সংস্কার আমাদের মূল দাবি। সমমনা দলগুলোর জন্য দরজা খোলা।”
গণঅধিকার পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খানও বলেছেন, “বাংলাদেশে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে। আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে নতুন শক্তি না গড়লে তা দেশের জন্য ক্ষতিকর হবে। তাই আমরা নতুন শক্তি হওয়ার চেষ্টা করছি। এনসিপির সঙ্গে একীভূত হওয়ার আলোচনা চলছে, পরে অন্য দলও যুক্ত হতে পারে।”
এনসিপির নেতৃত্বে আগামী নির্বাচনের আগেই একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক ব্লক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। দলটির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী জানিয়েছেন, এই ব্লকের নামও থাকবে এনসিপি এবং এতে গণঅধিকার পরিষদসহ একাধিক দল যুক্ত হবে। তাদের লক্ষ্য ৩০০ আসনে লড়াই করা, যদিও বাস্তবে ১৫০ আসনে জয়ের সম্ভাবনা দেখছেন তারা।
দলটির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, বিএনপি, জামায়াত বা অন্য কোনো বিদ্যমান দলকে তারা দেশের নেতৃত্বের জন্য উপযুক্ত মনে করেন না। তিনি বলেন, “আমরা আলাদা হয়েছি কারণ অন্য দলগুলোকে সমর্থন করা যাচ্ছে না। নিজেদের দল করে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোই আমাদের লক্ষ্য। অন্যরা যুক্ত হতে চাইলে স্বাগত।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তরুণদের নেতৃত্বে এনসিপি কেবল নতুন রাজনৈতিক দল হিসেবেই নয়, বরং দেশের রাজনীতিতে একটি তৃতীয় শক্তি বা বিকল্প জোট হিসেবে আত্মপ্রকাশের পথে। বিএনপি-জামায়াতের বাইরে এই নতুন বলয় সফলভাবে দাঁড়াতে পারলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন এক ভারসাম্য তৈরি হবে—এমন ধারণাই এখন জোরদার হচ্ছে।
Leave a Reply