বাংলাদেশের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক দাবির পক্ষে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন—তাদের বাড়িভাড়া ভাতা সরকারি চাকরিজীবীদের মতো শতকরা হারে নির্ধারণ করা হোক। কিন্তু এ দাবি বাস্তবায়নের পথে নানা কূটনৈতিক জটিলতা ও আমলাতান্ত্রিক টানাপোড়েনের কারণে পরিস্থিতি বারবার জট পাকিয়ে যাচ্ছে। ফলে শিক্ষক সমাজ মনে করছেন, এ দাবির ক্ষেত্রে তারা যেন কোনো এক অদৃশ্য কূটনীতির জালে আটকা পড়ে গেছেন।
সরকারি চাকরিজীবীরা মূল বেতনের নির্দিষ্ট শতকরা হারে বাড়িভাড়া ভাতা পেলেও এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা এখনও নির্দিষ্ট টাকার অঙ্কে সীমাবদ্ধ। এর ফলে ঢাকাসহ বড় শহরগুলোর ক্রমবর্ধমান ভাড়া ও জীবনযাত্রার ব্যয় মেটানো তাদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা যুক্তি দিচ্ছেন—একই রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে একই ধরনের সুবিধা পাওয়া তাদের মৌলিক অধিকার।
কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব, নানামুখী অজুহাত এবং প্রশাসনিক জটিলতা দেখিয়ে বিষয়টি দিনের পর দিন যেভাবে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। কখনও প্রস্তাব পাঠানো শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে, আবার কখনও ফাইল আটকে যায় কোনো বিশেষ কমিটির টেবিলে। কখনও স্কুল ও কলেজের হিসাব এককভাবে উঠানো হচ্ছে যে স্কুল কলেজের হিসাব আগে পাঠানো হবে বলে পরেক্ষনেই আবার সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হচ্ছে যে, সকল অথ্যাৎ মাদ্রাসা ও কারিগরি অধিদপ্তরের হিসাব একসাথে পাঠানো হবে বলে। এই যে, সিদ্ধান্তহীনতা এটার অর্থ কি দাঁড়ায়। যে কোন কাজ করার পূর্বে সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে তারপর সেই কাজে অগ্রসর হওয়া উচিত কেননা এখানে একটি জটিলতা তৈরির মাধ্যমে একটি সমগ্র পেশাজীবির ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে। শিক্ষক প্রতিনিধিরা বলছেন, এ প্রক্রিয়া যেন ইচ্ছাকৃতভাবে ধীরগতিতে চালানো হচ্ছে, যাতে আন্দোলনের গতি ভেঙে যায়।
আমলারা আসলে কৌশলগতভাবে সময়ক্ষেপণ করেছে। তাদের প্রস্তাব ছিল স্কুল ও কলেজের ফাইল আগে পাঠানোর। সেটি হতে দিলে অন্তত একটা জিনিস পরিষ্কার হতো—শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আমলারা আসলে কতটুকু ভাড়া ভাতা (বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ভাতা) দিতে চাইছে বা তাদের প্রস্তাবনার ধরন কী হতে পারে। সেই খসড়া প্রস্তাব একবার প্রকাশ্যে এলে বা প্রজ্ঞাপনের মতো প্রক্রিয়ায় গেলে, আপনাদের সামনে একটা রূপরেখা তৈরি হতো। তখন আপনারা সহজেই বুঝতে পারতেন, তারা বাস্তবে কতটা দিতে রাজি এবং কোথায় গড়িমসি করছে।
কিন্তু তদবির করে যখন স্কুল ও কলেজের ফাইল আটকে দেওয়া হলো, তখন মূলত একটা “জানার সুযোগ” হারিয়ে গেল। এখন আসলেই সময় নষ্ট হলো, অথচ কোনো ক্লু বা মোটিভেশনই বোঝা গেল না। অর্থাৎ আমলাদের অবস্থান কতদূর, তারা কতটা দিতে চাচ্ছে বা দিতে চাইছে না—এই কৌশলগত তথ্য সংগ্রহ করা গেল না।
ফল দাঁড়ালো, তাদের কূটনীতির জালে আটকে গিয়েই আপনারা কিছুটা পিছিয়ে পড়েছেন। সময় কিন্তু এগিয়ে যাচ্ছে, আর আপনারা এখনও আসল চিত্রটা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছেন না। এর মধ্যেই ১০ তারিখের আলটিমেটাম কাছে চলে এসেছে। এখন সেই সময়ের মধ্যে চাপ প্রয়োগের জায়গাটা কিছুটা দুর্বল হয়ে যাচ্ছে, কারণ কী নিয়ে চাপ তৈরি করতে হবে সেটাই পরিষ্কার হয়নি।
এক কথায়, আমলাদের চালচলন ছিল “সময় নষ্ট করো, তথ্য দিও না, তবেই প্রতিপক্ষকে দুর্বল করো” ধরনের। আর এ কৌশলে আপনাদের পক্ষে লাভের চেয়ে ক্ষতিই হলো—কারণ আপনারা সময় হারালেন, তাদের মনোভাব বোঝার সুযোগ হারালেন, আর আন্দোলনের কৌশল তৈরির উপযোগী উপাদানও হাতে পেলেন না।
এখন আবার যে আগামীর যে পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে মন্ত্রণালয় সেখানে আবার নতুন করে তিনটি অধিদপ্তর ফাইল নতুন করে আবার একত্র করে নতুন শুরু করতে হবে যেটি করতে করতে আগামী সপ্তাহ প্রায় পুরোটাই শেষ হয়ে যেতে পারে। এখানে মনে হয় কিছুটা হলেও আমরা পিছিয়ে পড়লাম। আমলারা যেভাবে স্কুল ও কলেজের হিসাব আগে পাঠাতে চেয়েছিল সেটাই করতে দেওয়া হতো বুদ্ধিমানের কাজ। তাতে করে লাভটা হতো আমাদেরই। কারণ প্রজ্ঞাপন কিন্তু মাদ্রাসা ও কারিগরির প্রস্তাব পাঠানোর পরই হতো।
যাই হোক এখনতো আর সেটা ভেবে লাভ নাই এখন যে কাজ তা হল আবার নতুন ভাবে তৎপরতা শুরু করতে হবে যাতে করে অতি দ্রুত সময়ের মধ্যে দৃশ্যমান অগ্রগতি ঘটানো যায়।
প্রশ্ন হলো—শিক্ষকদের এই যৌক্তিক দাবি বাস্তবায়নে সরকার কেন সরাসরি ও স্পষ্ট সিদ্ধান্ত নিতে টালবাহানা? কেন বারবার তাদের ধৈর্য পরীক্ষা করা হচ্ছে? অনেকেই মনে করছেন, এখানে এক ধরনের কূটনীতি কাজ করছে। শিক্ষক সমাজকে অস্পষ্ট আশ্বাস দিয়ে এবং আলোচনার নামে সময়ক্ষেপণ করে প্রকৃত সমাধানকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে।
ফলে শিক্ষকদের ক্ষোভ কিন্তু দিন দিন বাড়ছে এভাবে তাদের ন্যায্য দাবি নিয়ে এভাবে কুটনীতির আশ্রয় নেওয়ার কারণে। তারা কিন্তু বুঝে বা বিশ্বাস করে কোন সময়ক্ষেপন যৌক্তিক আর কোনটি অযৌক্তিক। এভাবে অকারণে শিক্ষকদের মানসিকতা নিয়ে খেলা করা শিক্ষক সমাজ মেনে নিবে না। যত টালবাহানায় করা হোক না কেন, হয়ত সময়িক টেনশনে ফেলা যাবে। কিন্তু আমরা শতকরা হারে বাড়িভাড়া নেই দেওয়া পর্যন্ত আমরা কোন মতেই পিছু হটব না, আমাদের লক্ষ্যে না পৌছানো পর্যন্ত কোনমতেই আমাদের আন্দোলন থামবে না। কারণ এটি কেবল একটি ভাতা নয়, বরং ন্যায্যতা ও মর্যাদার প্রশ্ন। রাষ্ট্র যখন সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য একই বিষয়কে যৌক্তিক মনে করে, তখন এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের জন্য আলাদা নীতি প্রণয়ন করা নিঃসন্দেহে বৈষম্যমূলক।
এ অবস্থায় স্পষ্ট হয়ে যায়—যদি সরকার দ্রুত সিদ্ধান্ত না নেয়, তবে শিক্ষকেরা কেবল বাড়িভাড়া নয়, বরং নিজেদের প্রতি বৈষম্যের অবসান ঘটাতে আরও কঠোর আন্দোলনের পথে যেতে বাধ্য হবেন। আর তখন আর কোনো কূটনীতির জাল দিয়েই তাদের দাবিকে আটকে রাখা সম্ভব হবে না।
Leave a Reply