বাংলাদেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের বহুদিনের দাবি হলো—সরকারি চাকরিজীবীদের মতো তাদেরও বাড়িভাড়া ভাতা শতকরা হারে নির্ধারণ করা হোক। এ দাবির প্রেক্ষাপট ঘিরে গত ১৩ তারিখ শিক্ষকদের আন্দোলনের পর শিক্ষা উপদেষ্টা শিক্ষক প্রতিনিধিদের উদ্দেশ্যে প্রস্তাব দেন—“আপনারা যৌক্তিকভাবে কত শতাংশ বাড়িভাড়া চান, তা লিখিতভাবে জমা দিন। তবে দাবি যেন অতিরিক্ত বা অযৌক্তিক না হয়, যেটি সরকারের সাধ্যের বাইরে পড়ে যায়।”
শিক্ষক প্রতিনিধিগণ বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়িভাড়া মূল বেতনের ২০ শতাংশ এবং চিকিৎসাভাতা ১৫০০ টাকা করার প্রস্তাব পেশ করেন। বর্তমানে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা সর্বজনীনভাবে মাত্র ১০০০ টাকা বাড়িভাড়া ও ৫০০ টাকা চিকিৎসাভাতা পাচ্ছেন। শিক্ষা উপদেষ্টা বিকল্পভাবে প্রস্তাব দেন—বাড়িভাড়া সর্বজনীনভাবে ২০০০ টাকা এবং চিকিৎসাভাতা ১০০০ টাকা করা যেতে পারে। কিন্তু শিক্ষক প্রতিনিধিদের মতে, এই প্রস্তাব দ্রুত বাড়তে থাকা জীবনযাত্রার ব্যয়, বিশেষ করে শহরাঞ্চলের ভাড়া বাজারের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়; বরং এটি অনেকটা অযৌক্তিক ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ যা অবশ্যই কোন পেশাজীবির সাথেই মানানসই নয়। আমরা আমাদের বাড়িভাড়া অবশ্যই শতকরা আকারে পেতে চাই।
শিক্ষক প্রতিনিধিদের ২০ শতাংশ বাড়িভাড়া ও ১৫০০ টাকার চিকিৎসাভাতার প্রস্তাবনা শুনে শিক্ষা উপদেষ্টা তাৎক্ষণিক মৌখিক সম্মতি দেন এবং ঘোষণা করেন—“দ্রুততম সময়ে বিষয়টি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আপনাদের এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একসাথে কাজ করতে হবে।” এই নির্দেশনার আলোকে গত মাসের ২০ তারিখ শিক্ষক প্রতিনিধিগণ তাদের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী একটি খসড়া শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেন।
এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করে এবং বিভিন্ন অধিদপ্তরের কাছে বিস্তারিত হিসাব-নিকাশ চেয়ে চিঠি পাঠায়। কিন্তু এখানেই শুরু হয় প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রীতা। আমলারা প্রথমে শুধু চিঠি পাঠাতেই প্রায় এক মাস সময় নেন। পরে অধিদপ্তরগুলো থেকে হিসাব আসলেও তাতে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। একবার বলা হলো—প্রথমে স্কুল-কলেজের হিসাব যাবে, পরে মাদ্রাসা ও কারিগরির। আবার কখনো বলা হলো—সব হিসাব একসাথে পাঠানো হবে। এই ধোঁয়াশা ও সময়ক্ষেপণের কারণে দিন গড়িয়ে যাচ্ছে, অথচ ঘোষিত সময়সীমা প্রায় শেষের পথে।
সবশেষে আবারও শঙ্কা তৈরি হয়েছে—যখন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ফাইল অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে, তখনও যেন নতুন করে দীর্ঘসূত্রীতা শুরু না হয়। কারণ অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, ফাইল আদান-প্রদানের নামে মাসের পর মাস চলে যায়, কিন্তু কার্যকর কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
এ অবস্থায় শিক্ষক সমাজে প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—এই বিলম্ব কি সত্যিই যৌক্তিক ও প্রশাসনিক কারণে হচ্ছে, নাকি এর আড়ালে আছে কোনো উদ্দেশ্যমূলক ষড়যন্ত্র? এটি কি সচেতনভাবে সময়ক্ষেপণের একটি কৌশল, নাকি আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে থাকা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া—এই প্রশ্নই এখন শিক্ষক-কর্মচারীদের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
শিক্ষক সমাজের অনেকেই মনে করেন, তাদের ন্যায্য দাবি পূরণে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে গড়িমসি করছে। এর পেছনে কয়েকটি কারণ তাঁরা উল্লেখ করেন—
অন্যদিকে নীতিনির্ধারকেরা দাবি করেন, বিষয়টি কেবল শিক্ষক সমাজের সমস্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
বাস্তবে বিষয়টি অনেকটা অযৌক্তিকতা এবং আংশিক অবহেলা—দুটো কারণেই বিলম্বিত হচ্ছে। একদিকে রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতার যুক্তি অস্বীকার করা যায় না; অন্যদিকে শিক্ষকরা যে বছরের পর বছর ধরে ন্যায্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, সেটিও স্পষ্ট সত্য। সরকারি চাকরিজীবীদের সঙ্গে তুলনা করলে শিক্ষকদের বৈষম্য প্রকট হয়ে ওঠে, যা পেশাগত মর্যাদাকে ক্ষুণ্ণ করছে।
বাড়িভাড়া ভাতা নির্ধারণের এ বিতর্ক মূলত রাষ্ট্রের আর্থিক দায় বনাম শিক্ষকদের ন্যায্য অধিকার—এই দ্বন্দ্বের প্রতিফলন। সরকার যদি শিক্ষকদের মর্যাদা রক্ষায় আন্তরিক হয়, তবে সময়ক্ষেপণের অভিযোগ এড়াতে একটি সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজেট বাস্তবতার যুক্তি দেখিয়ে অনন্তকাল ধরে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখাও নৈতিক নয়। তাই এখন প্রশ্ন শুধু ভাতার অঙ্ক নির্ধারণ নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার ভিত্তি রক্ষাকারী শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা রাষ্ট্র কিভাবে নিশ্চিত করবে—এটাই হওয়া উচিত আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।
আর যদি এভাবে অযৌক্তিক ও অযাচিতভাবে শিক্ষকের ন্যার্য অধিকার বিষয়ে এভাবে ঢিলেমি ব্যবস্থাপনা চলতে থাকে তাহলে কিন্তু সর্বশেষ রাজপথে নেমে অধিকার আদায় করা ছাড়া আর শিক্ষকদের কোন উপায় থাকবেনা। যেটা আমরাও চাই না। আমাদের সত্যিকারের ঠিকানা হলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমরা কখনও চাইনা রাজপথে নেমে আসতে। কিন্তু যদি রাজপথে নামতে বাধ্য করা হয় তবে অবশ্যই তার দায়িত্ব কিন্তু আমরা নেব না।
Leave a Reply