শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড—এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই মেরুদণ্ড শক্ত রাখার জন্য যারা দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন, সেই এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীরা আজও ন্যায্য প্রাপ্য থেকে বঞ্চিত। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যদি এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের ২০% ও ন্যূনতম ৩,০০০ টাকা বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হয়, তাহলে সরকারের মাসিক খরচ হবে প্রায় ৩০১.৩৬ কোটি টাকা, যা বার্ষিক দাঁড়াবে প্রায় ৩৬১৫.২৯ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, যদি ১৫% ও ন্যূনতম ২,০০০ টাকা ভাতা দেওয়া হয়, মাসিক খরচ হবে প্রায় ২২১.৩৩ কোটি টাকা, আর বার্ষিক খরচ দাঁড়াবে ২৮৫৫.৯৩ কোটি টাকা। একইভাবে ১০% ও ন্যূনতম ২,০০০ টাকা দিলে মাসিক খরচ দাঁড়াবে ১৬৫.৪৭ কোটি টাকা এবং বার্ষিক খরচ হবে ১৯৮৫.৬৪ কোটি টাকা। আর ৫% ও ন্যূনতম ২,০০০ টাকা প্রদান করলে মাসিক প্রয়োজন হবে ১৩২.৩১ কোটি টাকা এবং বার্ষিক খরচ হবে ১৫৮৭.৭৬ কোটি টাকা।
এখন প্রশ্ন হলো, যারা দেশের ৯৭% শিক্ষার দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে দিন-রাত শিক্ষার্থীদের মানুষ হিসেবে গড়ে তুলছেন, সেই শিক্ষক-কর্মচারীদের জন্য এই অর্থ ব্যয় করা কি অন্যায় হবে? আমরা যদি খোলামেলা আলোচনা করি, দেখা যাবে—সরকার নানান সময় বিভিন্ন খাতে বিলাসী ব্যয় করে থাকে। কখনো ঋণনির্ভর প্রকল্পে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ানো হয়, আবার কখনো বিদেশ ভ্রমণের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। অথচ এই ব্যয়ের ক্ষেত্রে খুব কমই প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু শিক্ষকদের ন্যায্য প্রাপ্যের প্রসঙ্গ এলেই “অর্থের অভাব” কিংবা “সুবিধা-অসুবিধা”র নানা যুক্তি সামনে চলে আসে।
এই বৈষম্যমূলক বাস্তবতায় শিক্ষকদের ক্ষোভ ও বঞ্চনা বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। শিক্ষাক্ষেত্রে যারা প্রকৃত পরিবর্তনের বাহক, তাদের প্রতি যদি রাষ্ট্র উদাসীন থাকে, তবে দীর্ঘমেয়াদে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে গোটা জাতির ওপর। শিক্ষককে শুধু কর্মচারী হিসেবে নয়, বরং জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
তাহলে সমাধান কোথায়? সমাধান একটাই—শিক্ষক সমাজের ন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া। বাড়িভাড়া, চিকিৎসা ভাতা বা অন্যান্য মৌলিক প্রাপ্য তাদের হাতে পৌঁছে দেওয়া। এতে রাষ্ট্রের কোনো ক্ষতি হবে না বরং লাভ হবে বহুগুণ। কারণ, শিক্ষক যখন সম্মানজনক জীবনযাপন করতে পারবেন, তখন তিনি আরও মনোযোগী হয়ে শিক্ষার্থীদের জ্ঞানচর্চা ও মানুষ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করতে পারবেন।
সর্বোপরি, একটি জাতি যদি তার শিক্ষককে অগ্রাধিকার না দেয়, তবে সেই জাতির ভবিষ্যৎ উন্নতি কতটা টেকসই হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। তাই সরকারের প্রতি আহ্বান—যেভাবে অন্যান্য খাতে ব্যয়ের যুক্তি তৈরি করা হয়, সেভাবেই যেন শিক্ষা ও শিক্ষকদের জন্যও অগ্রাধিকারমূলক বাজেট নিশ্চিত করা হয়। কারণ, শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ কখনো অপচয় নয়, বরং এটি হলো ভবিষ্যতের সবচেয়ে লাভজনক বিনিয়োগ।
“শিক্ষক বাঁচলে শিক্ষা বাঁচবে, আর শিক্ষা বাঁচলে দেশ বাঁচবে।”
Leave a Reply