নির্বাচনের বাতাস বইতে শুরু করায় দেশের রাজনীতির মাঠে এখন নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ চলছে। বড় বড় রাজনৈতিক দলগুলো যেখানে নির্বাচন-পূর্ব ও নির্বাচন-পরবর্তী জোট, আসন ভাগাভাগি কিংবা কৌশলগত অবস্থান নিয়ে ব্যস্ত, সেখানে তরুণ নেতৃত্বাধীন কয়েকটি নতুন দলও নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করার চেষ্টায় নেমেছে। এ ধরনের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও গণঅধিকার পরিষদের একীভূত হওয়ার বিষয়টি। রাজনৈতিক অঙ্গনে তরুণদের শক্তিকে একত্র করে একটি শক্তিশালী বিকল্প শক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই দুই দলের মধ্যে আলোচনা চলছে। যদিও এখনো এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি, তবে দুই দলের নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কার্যক্রম স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দিচ্ছে যে প্রক্রিয়াটি অনেক দূর এগিয়েছে।
দুটি দলের জন্মপ্রেক্ষাপটও অনেকটাই অভিন্ন। ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ। সেই ছাত্র আন্দোলন থেকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে গণঅধিকার পরিষদ, যা ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয়। অপরদিকে ২০২৪ সালের কোটা আন্দোলন ঘিরে যে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার সঙ্গে যুক্ত নেতাকর্মীরাই আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের কিছুদিন পর নতুন রাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এনসিপি প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া এনসিপির শীর্ষ পর্যায়ের বহু নেতাই তাদের রাজনৈতিক হাতেখড়ি নিয়েছিলেন নুরুল হক নুরের নেতৃত্বাধীন সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের মাধ্যমে। ফলে নুরুল হক নুরকে এখনো এনসিপির অনেক নেতা রাজনৈতিক গুরু হিসেবে মানেন। বর্তমানে গণঅধিকার পরিষদ নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনপ্রাপ্ত হলেও এনসিপি এখনো সে সুযোগ লাভ করতে পারেনি।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন একীভূত হওয়ার বিষয়ে সরাসরি কিছু না বললেও মধ্যপন্থীদের সঙ্গে হাত মেলানোকে ইতিবাচক হিসেবে দেখার কথা জানিয়েছেন। অপরদিকে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ও জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি ফারুক হাসানও প্রকাশ্যে না হলেও ইঙ্গিতপূর্ণভাবে বলেছেন, তারুণ্যের শক্তিগুলোকে এক করতে তাঁদের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। দুই দলের শীর্ষ নেতাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, হাসপাতালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অ্যাকশনে আহত হয়ে ভর্তি থাকা গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুরকে দেখতে গিয়েছিলেন এনসিপির কয়েকজন শীর্ষ নেতা। সেখানে উভয় পক্ষের মধ্যে আনুষ্ঠানিক নয়, তবে একীভূত হওয়ার বিষয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়।
গণঅধিকার পরিষদ থেকে এনসিপিতে যোগ দেওয়া এক নেতা বলেন, “একীভূত হওয়ার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি অনানুষ্ঠানিক পর্যায়ে রয়েছে। কোনো কংক্রিট সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে রাজনৈতিক পরিসরে এমন আলোচনা আছে যে, তরুণরা এক হোক। তাদের একত্রিত হয়ে কাজ করা উচিত। সেই চিন্তা থেকেই আলোচনা চলছে।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, নুরুল হক নুরের অসুস্থতার কারণে বিষয়টি দ্রুত আনুষ্ঠানিক রূপ নিচ্ছে না।
গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা স্পষ্টভাবে বলেন, “এনসিপির সঙ্গে মার্জ (একীভূত) হওয়ার আলোচনা চলছে। উভয় পক্ষেরই আগ্রহ আছে। যদি এই প্রক্রিয়া সফল হয়, তাহলে আমাদের সঙ্গে আরও কয়েকটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম যুক্ত হতে পারে।” তাঁর মতে, ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে সাম্প্রতিক পরাজয়ের পর এনসিপি চাপের মুখে পড়েছে, আর এখন আলাদা জোট গড়ে তেমন কোনো ফল পাওয়া সম্ভব নয়। তবে দুটি তরুণ নেতৃত্বাধীন দল এক হলে নির্বাচনী মাঠে একটি বড় শক্তি তৈরি হতে পারে।
দুই দলের নেতারা জানিয়েছেন, একীভূত হলে নতুন দলের নাম রাখা হবে এনসিপি। তবে কাঠামোতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। কত দিনের মধ্যে একীভূতকরণ হতে পারে—এমন প্রশ্নের উত্তরে এক নেতা বলেন, “এখানে নেতাদের মধ্যে ম্যাচআপ, কর্মীদের মধ্যে ম্যাচআপের মতো বিষয় আছে। এগুলো সময়সাপেক্ষ। তবু আমরা চাই, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই বিষয়টির সমাধান হোক।”
এনসিপির একাধিক শীর্ষ নেতা স্বীকার করেছেন যে গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে একীভূত হওয়ার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে তাঁরা নাম প্রকাশ করতে চাননি। একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক নেতা বলেন, “গণঅধিকার পরিষদ এনসিপিতে যোগ দিতে চায়, এমন আলোচনা আমাদের মধ্যে আছে। আমরা নিজেদের ফোরামে বিষয়টি আলোচনা করছি এবং তাঁদের সঙ্গেও আলাপ চলছে। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।” আরেকজন এনসিপি নেতা জানিয়েছেন, সম্প্রতি তাঁদের নির্বাহী কমিটির বৈঠকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রস্তাবও অনুমোদন করা হয়েছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন মন্তব্য করতে না চাইলেও বলেছেন, “আমরা একটি মধ্যপন্থী রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই। বাংলাদেশে যারা মধ্যপন্থী রাজনীতির সঙ্গে একাত্মতা বোধ করে, তাঁদের যেকোনো ধরনের যুক্ত হওয়াকে আমরা ইতিবাচকভাবে দেখি।” অপরদিকে গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র ফারুক হাসান বলেন, “আলোচনা অনেক কিছুরই হচ্ছে। কোনো কিছু ঘটলে সবাই জানতে পারবেন। আমরা চেষ্টা করছি তারুণ্যের শক্তিগুলোকে এক করতে।”
সবশেষে, এনসিপির এক নেতা স্পষ্ট করেছেন যে আপাতত কেবল গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গেই আলোচনা চলছে। অন্য কারও সঙ্গে এখনো এমন কোনো আলাপ হয়নি। তাঁর মতে, “আমাদের আলোচনা কিছুটা অগ্রসর হয়েছে, তবে এখনো অনেকগুলো ইস্যু অমীমাংসিত রয়ে গেছে।”
সব মিলিয়ে বলা যায়, তরুণ নেতৃত্বাধীন এই দুটি দলের একীভূত হওয়ার আলোচনা দেশের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আলোচনা বাস্তব রূপ পায় কি না এবং নির্বাচনী রাজনীতিতে তরুণদের এই সম্মিলিত শক্তি কতটা প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়, তা নির্ভর করবে আসন্ন দিনগুলোর ওপর।
Leave a Reply