নেপালের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের জন্ম হলো। দেশের সর্বোচ্চ আদালতের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতি হওয়ার পর এবার প্রধানমন্ত্রী পদেও প্রথম নারী হিসেবে ইতিহাস গড়লেন সুশীলা কার্কি। বয়স ৭২ বছর হলেও তিনি শুক্রবার (১২ সেপ্টেম্বর) রাত সওয়া ৯টায় রাষ্ট্রপতি রামচন্দ্র পাওডেলের কাছে শপথ নিয়ে নেপালের অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নিলেন। শীতল নিবাস রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতায় দেশ নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়লে আন্দোলনকারীরা সুশীলাকে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে প্রথম প্রস্তাব দেন। তিনি শর্ত রাখেন—অন্তত এক হাজার লিখিত স্বাক্ষর পেলে প্রস্তাব বিবেচনা করবেন। কিন্তু শুরুতেই তাঁর পক্ষে দুই হাজার পাঁচশোরও বেশি স্বাক্ষর জমা পড়ে। এতে আন্দোলনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁকে মনোনীত করেন। যদিও বৃহস্পতিবার আন্দোলনকারীদের একাংশ প্রাক্তন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কুল মান ঘিসিঙের নাম প্রস্তাব করায় কিছুটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল।
এর আগে মঙ্গলবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা অলির পদত্যাগের পর নতুন নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়। কাঠমান্ডুর জনপ্রিয় মেয়র ও তরুণ র্যাপার বলেন্দ্র শাহ ওরফে ‘বলেন’-এর নাম আলোচনায় এলেও ছাত্র-যুব নেতৃত্ব সুশীলা কার্কির নাম সামনে আনে। এমনকি বলেনও তাঁর প্রতি সমর্থন জানান। অবশেষে শুক্রবার ভোটাভুটির মাধ্যমে সুশীলার নাম চূড়ান্ত হয়।
শপথের পরপরই সুশীলা কার্কি একটি ছোট আকারের অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠনের ঘোষণা দেন। জানা গেছে, শুক্রবার রাতেই তিনি প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠক করবেন, যেখানে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়ার প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধের প্রতিবাদে তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জিরা রাস্তায় নামে। গত সোমবার বিক্ষোভকারীরা পার্লামেন্টে প্রবেশের চেষ্টা করলে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু শিক্ষার্থী নিহত হন। এতে ক্ষোভ চরমে ওঠে। মঙ্গলবার অলি পদত্যাগ করে আত্মগোপনে চলে যান। বিক্ষোভকারীরা সাবেক কয়েকজন প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি ও মন্ত্রীদের বাসভবনে হামলা চালায়, এমনকি অর্থমন্ত্রীকে প্রকাশ্যে মারধরও করা হয়। এই পরিস্থিতিতেই নতুন নেতৃত্বের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে এবং শেষ পর্যন্ত সুশীলা কার্কিকে প্রধানমন্ত্রী করা হয়।
সুশীলা কার্কির জন্ম ১৯৫২ সালে। তিনি ভারতের বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন। কর্মজীবন শুরু করেন শিক্ষকতা দিয়ে, পরে আইন পেশায় যুক্ত হন। ২০০৯ সালে তিনি নেপালের সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি হন এবং ২০১৬ সালে দেশের প্রথম নারী প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পান।
বিচারপতি হিসেবে দুর্নীতি বিরোধী কঠোর অবস্থানের কারণে তিনি বিশেষভাবে পরিচিত ছিলেন। তাঁর নির্ভীকতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়পরায়ণতা তাঁকে বিশেষ করে তরুণদের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক আন্দোলনের সময় নতুন প্রজন্ম তাঁকেই আস্থার প্রতীক হিসেবে সামনে আনে।
২০১৬ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের পর তিনি অবসর নেন। এবার আবারও ইতিহাস রচনা করলেন নেপালের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হয়ে।
নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসে নারী নেতৃত্বের দৃষ্টান্ত খুবই বিরল। রাষ্ট্রপতি বিদ্যাদেবী ভাণ্ডারীর পর এবার প্রধানমন্ত্রী হলেন সুশীলা কার্কি। সততা, আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতীক এই নারী বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় স্থিতিশীলতার আশ্বাস নিয়ে এসেছেন।
তাঁর সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—একদিকে বিক্ষুব্ধ তরুণ প্রজন্মের আস্থা ধরে রাখা, অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার টেবিলে ফেরানো। তবে তাঁর অতীত কর্মজীবন, সততা ও সাহসী ব্যক্তিত্ব দেখে অনেকেই আশাবাদী যে, সুশীলা কার্কির নেতৃত্বে নেপাল নতুন রাজনৈতিক দিশা পাবে।
Leave a Reply